নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক–কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে ছয় দিন কার্যত অচল ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। এতে বন্দরের জেটি, টার্মিনাল, শেড ও ইয়ার্ডে বিপুল পরিমাণ কনটেইনার জমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে বন্দর, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলো।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া কর্মবিরতি প্রথম তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে চললেও মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পুরোদমে পালিত হয়। বৃহস্পতিবার বিকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর জানান, উপদেষ্টার আশ্বাস বাস্তবায়ন না হলে আগামী রবিবার থেকে আবার কর্মবিরতি শুরু হবে।
কর্মবিরতির কারণে মঙ্গলবার ও বুধবার বন্দরে একটিও কনটেইনার ডেলিভারি হয়নি। ৫৯ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতার বন্দরে বর্তমানে জমে আছে ৩৭ হাজার ৩১২টি কনটেইনার। কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতেও রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনারের স্তূপ বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্দরের তিনটি প্রধান টার্মিনাল—জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)—সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ছিল। জেটিতে থাকা ১১টি জাহাজের ক্রেন গুটিয়ে রাখা হয় এবং গ্যান্ট্রি ক্রেনের বুম ওপরে তুলে রাখা হয়।
এ অবস্থায় বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে ৯৮টি জাহাজ। এর মধ্যে ১২টি কনটেইনারবাহী, ২৯টি জেনারেল কার্গো, ২২টি খাদ্যসামগ্রী, পাঁচটি চিনি ও দুটি লবণবোঝাই জাহাজ রয়েছে। আগামী এক সপ্তাহে আরও এক ডজনের বেশি জাহাজ আসার কথা থাকায় কর্মবিরতি দীর্ঘ হলে রমজানের আগে জাহাজজট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের বাধার কারণে বন্দরের মূল তিনটি টার্মিনাল থেকে কোনো জাহাজ ছেড়ে যেতে পারেনি এবং নতুন জাহাজও ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার বন্দরে ঢুকতে পারছে না, আমদানি পণ্যও খালাস হচ্ছে না।
এতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে তৈরি পোশাক খাত। বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কর্মবিরতি দীর্ঘ হলে রফতানি কনটেইনার রেখে বড় জাহাজগুলো বন্দর ছেড়ে যেতে পারে, যা পোশাক খাতে অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হবে।
চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার রফতানি কনটেইনার জমে আছে। ডিপো সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, কর্মবিরতির কারণে ডিপো থেকে বন্দরে কনটেইনার আনা–নেওয়া বন্ধ থাকায় ডিপোগুলোর আয়ও মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট বার্থ অপারেটরদেরও বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। বন্দর বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরীর দাবি, প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে ক্ষতির মুখে পড়ছে ১২টি বার্থ অপারেটর। ছয় দিনে এই ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
এদিকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে ইতোমধ্যে ৩১ জন বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে, যা আন্দোলনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। যদিও বদলিকৃত কর্মস্থলে এখনো কেউ যোগ দেননি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ জানিয়েছে, এখনো রাজস্ব আদায়ে বড় প্রভাব না পড়লেও পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বন্দরের ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ।



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।