আমি কোর্ট হিল নামের পরীর পাহাড় বলছি– আমার একটি দিনের গল্প শুনুন

0

কর্ণফুলীর গানের আমার ভোর হয়
পূবের আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পুরো শহর এখনো হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা। কল কল বয়ে চলা কর্ণফুলী আমার ঝিমুনিক যেন উপহাস করছে। টারশিয়ারী যুগে যখন আমার জন্ম হচ্ছিল তখন থেকে ছোট্ট ঝর্ণারূপী আজকের এই কর্ণফুলীর সাথে আমার মিতালী। রাতের গুন্গুন্ মৃদ সংগীত আমাকে ঘুম পাড়ায়। আর ভোরে তার কল কল শব্দ আমাকে জাগিয়ে তুলে।
একটা সময় ছিল যখন ঘন ঝোপ-ঝাড়, বড় বড় বৃক্ষ ও চমৎকার সব লতাগুলো ভর্তি ছিল আমার এই শরীর। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে জমিদার অখিল চন্দ্রের নিকট থেকে আমাকে হুকুম-দখল করার সময়ে যথার্থই আশংকা করেছিলাম-আমার গায়ে কোদাল পড়বে। কুঠারের আঘাত জর্জরিত হবে আমার শরীরের বেড়ে উঠা উদ্ভিদগুলো। লাল দালান তৈরীর সময় অসংখ্য গাছপালা কাটা পড়ে। ধ্বংস হয়ে যায় অনেক পাখ-পাখালির বাসা। একটা সময় পাখ-পাখালির ডাকে মুখরিত ছিল আমার সারা অঙ্গন। অগণিত টিয়া, তোতা, ময়না, শালিক এবং নাম নাজানা পাখির আবাস ছিল আমার গা জুড়ে। অথচ আজকাল ঘুম ভাঙ্গার পর শুনি কা…কা আওয়াজ।

মানুষের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাই
লাল রঙের সূর্য ধীরে ধীরে কমলা রঙ ধারণ করছে। জেগে উঠছে নগরী। নতুন পুরাতন আদালত ভবনগুলোর বারান্দায় অনেক মানব-মানবী ঘুমিয়ে আছে। কেউ কেউ চাদর মুড়ি, কেউবা পলিথিনের নিচে। আধুনিক সভ্যতায় এমন জীবনও হয় মানুষের, ভাবতে অবাক লাগে!
অফিসের সময় ঘনিয়ে আসছে। আমার গা বেয়ে উঠছে মানুষ, বিভিন্ন ধরণের যান। ঐ যে, ঐ সাদা শ্মশ্রুমন্ডিত মানুষ, জীর্ণ পোশাক আর শীর্ণ শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে, তাঁকে আমি গত পঞ্চাশ বছর ধরে দেখছি। কিশোর বয়সে দেখেছি বাবার পিছনে পিছনে ফাইলপত্র নিয়ে চপল পায়ে হেঁটে যেতে। যুবক বয়সে দেখেছি গর্বিত ভঙ্গিতে আমার গা বেয়ে উঠে আসছে। বাবার মৃত্যুর পর বাবারই দায়ের করা মামলায় তদবির করতে করতে সেই দিনের শক্তসামর্থ যুবকের আজ এই অবস্থা। মাসখানেক আগে মসজিদের সিঁড়িতে বসে সাথে আসা গ্রামের লোককে উদ্দেশ্য করে দুঃখভরা কন্ঠে বলছিল— ‘হয়ত এই কোর্ট বিল্ডিংয়ে আসতে আসতেই আমার মৃত্যু হয়ে যাবে, কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি হবে না। বাবা যে কেন তাঁর আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে এই মামলা করতে গিয়েছিলেন! কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করলেও পারতেন।” এ রকম অনেক মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার আমি প্রতিনিয়ত শুনতে পাই।

আমি দুষিত হয়ে গেছি
বেলা অনেক হয়ে গেছে। শুরু হয়ে গেছে হাজারো মানুষের আসা যাওয়া। কালো ধোঁয়ায় আমাকে দুষিত করে উঠানামা করছে শত শত গাড়ী। বৃদ্ধ, রুগ্ন কিংবা শারীরিকভাবে অসমর্থ ব্যক্তি ব্যতীত অন্যদের জন্য গাড়ী নিয়ে উঠা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আমি শব্দদূষণ এবং বায়ুদুষণ থেকে অনেকখানি রক্ষা পেতাম। তাছাড়া যানজটে ইদানিং লোকজনকে কষ্ট পেতে দেখছি। বেশকিছু ভবন উঠেছে আমার গায়ের ওপর। কিন্তু গাড়ী পার্কিয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়নি। যা আমাকে অবাক করে। আমি যখন ঘন জঙ্গলে আবৃত ছিলাম তখন দেখেছি বন্যপ্রাণীরাও নিজেদের যাতায়াতের পথকে তাদের মত করে প্রতিবন্ধকহীন তথা পরিছন্ন করে রাখতো। এ ক্ষেত্রে বুনো পিঁপড়ে সবচেয়ে অগ্রগামী। পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় জীব বৈচিত্র্যের কোন কিছুই আমার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। এটা মেনে নেয়ার কষ্টকর।

বাদশা হয় চোর, চোর হয়ে যায় বাদশা
হঠাৎ শোরগোল শুনতে পাচ্ছি। বাঁশির শব্দ এবং সাইরেনের আওয়াজ যুগপৎ শুনা যাচ্ছে। একটি প্রিজন ভ্যানকে মাঝখানে রেখে বেশ কয়েকটা পুলিশের গাড়ী উপরের দিকে উঠে আসছে। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা চোখে পড়ার মত। শুরু হয়ে গেছে গোয়েন্দাদের আনাগোনা। মনে হচ্ছে-কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে আজ আদালতে হাজির করা হবে। দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। প্রিজন ভ্যানের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখি-অন্য কয়েকজন আসামিদের সাথে অপেক্ষাকৃত বেশী বিমর্ষ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এই দেশের অত্যন্ত পরিচিত একজন ব্যক্তি। অনেক প্রভাব-প্রতিপত্তি তাঁতর এই সমাজে। অনেক ধন-দৌলত। রাজ্যের ওজারতিও করেছেন। অথচ কত অসহায় আজ। ভীত-আতঙ্কিক চাহনি তার। চারপাশের লোকজন তাঁকে বহনকারী গাড়ীর দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছে। ছুঁড়ে দিচ্ছে বিভিন্ন রকম মন্তব্য।
এই হচ্ছে ভাগ্য! এরই নাম নিয়তি। অসীম ক্ষমতাবান সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর সবকিছুকে এক অজানা রহস্যময়তা দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। রাজা-বাদশা, আমির-ওমরা ও উজির-নাজির, যে কেউই তাঁর ইশারায় মুহুর্তেই পথের ভিখারি কিংবা এর চেয়েও নিচে পড়ে যায়। তাঁরই ইচ্ছায় চোখের পলকে বাদশা হয় চোর, চোর হয়ে যায় বাদশা। বেশীরভাগ মানুষেরই মহান সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নেই। এ জন্যেই তারা নিশ্চিন্ত এবং নির্বিকার থেকে মন্দ কাজ করে যায়। আবার অনেকেই থাকে উদাসীন। খারাপ কাজ করে না ঠিকই; কিন্তু স্রষ্টার কাছে সদা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তাও অনুভব করে না। কিন্তু জড় জগতের অধিবাসী হিসেবে অনেকের মত আমি সৃষ্টিকর্তার অপরিসীম দয়া এবং অসীম ক্ষমতার কথা ভেবে সর্বদা তার ভয়ে ভীত থাকি।

প্রার্থনা করি-কুমারী মাতা ও নিষ্পাপ শিশু যেন অধিকার ফিরে পায়
অগ্রহায়ণ মাসের এক রোদেলা দুপুর আজ। ঝকঝকে নীল আকাশ। ধবধবে সাদা মেঘ এদিক সেদিক ধেয়ে যাচ্ছে। আমিও মাঝে মাঝে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি, আকাশের বিশালতায় আমার মন চায় হারিয়ে যেতে। মানুষের নানামুখী জটিলতা-কুটিলতা দেখতে দেখতে আমি হাঁপিয়ে উঠছি।
হঠাৎ একটি মেয়ের দিকে তাকাতেই চিন্তাকে আকাশ থেকে নামিয়ে আনি। গত তিন বছর ধরে দেখছি-একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে প্রায়শঃ কোর্টে আসা যাওয়া করছে। তিন বছর আগের নবজাতক এখন নিজ হাতে ধরে পানি খেতে শিখেছে। আমার সারা অঙ্গজুড়ে বৈধ-অবৈধ অসংখ্য দোকান গজিয়ে উঠেছে। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম, কোন দিকই ক্ষতমুক্ত নয়। সে রকম একটি দোকান থেকে অভাগী মেয়েটি তিন পিচ পাউরুটি ও একটি কলা কিনছিল কোলের বাচ্চাকে দাঁড় করিয়ে রেখে। তখনই শিশুটি দোকানের বাইরে টুলের উপর রাখা খালি গ্লাসের দিকে হাত বাড়ায়। পানি নেই বুঝতে পেরে দোকানী নিজেই জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে দেয়।
মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ সবটুকু এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এই শিশুটির বৈধ পিতৃ পরিচয় নেই। মাজারকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করেছে মর্মে মিথ্যা প্রবোধ দিয়ে তার মায়ের সাথে মেলামেশা করেছে এক নরপশু। সেই মেলামেশার ফসল এই নিষ্পাপ শিশু। এ ধরনের অঘটন অহরহ ঘটছে। তবে এটা সুখখর যে, এ রূপ অপকর্মের শাস্তি হচ্ছে। কয়েকদিন আগেও এক শিশু বৈধ পিতৃ পরিচয় অর্জনে সক্ষম হয়েছে আদালতের রায়ে। স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি- এই কুমারী মাতা ও অবুঝ নিষ্পাপ শিশুর ভাগ্যও যেন সেরূপ মহত্বের দেখা পায়।

মানুষ জানে না- কোনটা তার জন্য অপেক্ষাকৃত বড় বিপদ
হেমন্তের কোমল বিকেলের ছোঁয়া টের পাচ্ছি আমার সারা দেহ জুড়ে। হঠাৎ মেয়েলি কন্ঠের বুকফাটা কান্নার আওয়াজ পুরো পরিবেশকে বিষণ্ন করে তুলল। আদালতের রায়ে মহিলাটির স্বামী খুনের মামলায় সাজা প্রাপ্ত হয়েছে। মহিলার সাথে ফুঁপিয়ে কাঁদছে দুই তিনটি ছেলেমেয়ে। মহিলা চিৎকার করে বলছে, ‘সাধারণ লোক হলেও এই মানুষটার কথা একশত ভাগ সত্যি। কোনটার মধ্যে মঙ্গল আছে তা কেবল বিধাতাই ভাল জানেন। এমনও ঘটনা আছে-খুনের মামলার আসামি মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে আমার পাদদেশে দাঁড়িয়ে গাড়ীর জন্য অপেক্ষরত অবস্থায় বেপরোয়া গতির বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা গেছে। এই সংবাদ বিচারককে তাঁর অধীনস্থ কোন এক কর্মচারী জানায় এবং বলে ‘স্যার, আপনি ওকে দুই বছরের সাজা দিলেও সে বেঁচে যেতো।’
অথচ সত্যি সাজা হলে সে আসামি মনে করত-এটা তার জন্য বড় বিপদ। সে সাজা পরোয়ানা মূলে হাজতে গেলে জানতেও পারতো না যে, বাইরে তার জন্য ‘মৃত্য’ অপেক্ষা করছিল। আত্মীয় স্বজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় মহিলাটি উত্তর দিকের রাস্তা ধরে নেমে গেলে কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে আসল।

মৃত্যুদূত ও আজরাইলের অশরীরী আত্মা
বিষণ্ন বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধার সাথে মিলিত হওয়ার চেষ্ট করছে। মানুষের আনাগোনা কমে আসছে। যন্ত্র-দানবগুলোও বিদেয় নিচ্ছে আজকের মত। এমন সময় দেখি-আইনজীবী ভবনের সামনে কিছু মানুষের জটলা। চার-পাঁচ জন লোক অচেতন একজন মানুষকে ধরাধরি করে একটা মাইক্রোবাসে উঠাচ্ছে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। অচেতন লোকটি আইনজীবী না মক্কেল তা বুঝতে পারছি না। এই লোককে যেখানেই নিয়ে যাওয়া হোক না কেন তাকে আর বাঁচানো যাবে না। তার পিছনে আমি মৃত্যুদূতকে দেখতে পাচ্ছি। অবিশ্বাস্য তৎপরতায় তিনি তাঁর কাজ সেরে নিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পরে হয়ত তাঁর আত্মা নিয়ে উর্ধ্ব আকাশে যাত্রা করবেন। অচেতন মানুষটি ব্যতীত কোন মানুষই তাঁকে দেখছে না।
যে ব্যক্তিকে নিতে আসে সে ছাড়া অন্য কোন মানুষ মৃত্যুদূতকে দেখতে পায় না। এটা মহান বিধাতার আশ্চর্য বিধান। তবে প্রাণীজগৎ, উদ্ভিজ্জগৎ ও জড় জগতের বাসিন্দারা দেখতে পায়। মানুষকে সৃষ্টিকর্তা যে সব অসংখ্য সীমাবদ্ধতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, এই সীমাবদ্ধতা তাঁর মধ্যে অন্যতম। কাছে পিঠে মৃত্যুর হাজারো আনাগোনা মানুষ বিন্দুমাত্রও টের পায় না। মৃত্যুদূত ও তার কার্যক্রম দেখলে মানুষ পার্থিব জীবনে সব কাজ ছেড়ে দিয়ে নিশ্চল বসে থাকবে।
তাই পরম করুণাময় এই সীমাবদ্ধতা মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, আমার বুক জুড়ে ঘুরে বেড়ানো অজরাইলের অশরীরী আত্মার অস্তীত্ব এখানে প্রতিনিয়ত কর্মরত মানুষগুলো অনুভব করতে পারে না। অথচ অনেক ঘটন-অঘটনের পিছনে এসব অশরীরী আত্মাগুলি সক্রিয় থাকে। আগের যুগে এগুলো বেশী সংখ্যায় সক্রিয় ছিল। উদ্ভিজ জঙ্গলের স্থলে ইট পাথরের দঙ্গল হওয়ায় তাদের অবস্থানের জায়গা কমে গেছে। তারপরও সংখ্যায় একেবারে কম নয়। অচেতন লোকটাকে বহন করে মাইক্রোবাসটা চলে গেল।

আমি আর বোঝা নিতে পারছি না
পশ্চিম লাল হয়ে গেছে। ঝির ঝির বাতাস বইছে। বোঝা যাচ্ছে -বেশ মিষ্টি করে সন্ধ্যা নামছে। ব্যায়ামের পোশাক পরে অনেকে হেঁটে ওপরে সমতল ভূমির দিকে যাচ্ছে। কয়েকবছর আগে আমার পিঠ জুড়ে কোলাহল মুখর সন্ধ্যা নামত। সেটা অনেকটাই কমে গেছে। অপরিকল্পিত এবং অবৈধ স্থাপনাগুলোর জন্য বেড়ানো কিংবা হাঁটার জায়গা কমে গেছে। শুনছি– নতুন আরেকটি ভবন উঠবে। আমার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ ঘেঁষে নাকি তৈরী হবে সেই ভবন। গ্যাসসহ ভূ-গর্ভস্থ মূল্যবান খনিজ সম্পদ উত্তেলিত হতে থাকা এবং ভূ-গর্ভে পানির স্তর নিচে নামতে থাকায় আমি যে মহাদেশীয় প্লেটের উপর দাঁড়িয়ে আছি তা ভারসাম্য হারাচ্ছে।
আমার ওপর অতিরিক্ত ভবন চাপিয়ে দেওয়ায় আমি আর ভার নিতে পারছি না। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বুঝি ধ্বসে পড়লাম! নতুন প্রস্তাবিত ভবনটা কী খুব দরকার ছিল? ডিসি অফিস অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে পুরো লাল দালানটা বিচারিক কার্যক্রমের জন্য নিয়ে নেয়া যেত।

আমিও জেনেছি-চেরানগর নীচদ্দি আঁধার থাহে
বিভিন্ন ভবনের বারান্দাগুলোতে যেন আগে ভাগেই সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘন অন্ধকার ঘিরে ধরছে আমাকে। ভবনসমূহে বৈদ্যুতিক বাতিগুলো জ্বলে উঠায় অন্ধকার অনেকখানি কেটে গেছে। এরপরও অন্ধকার ঘাপটি মেরে বসে আছে বিভিন্ন জায়গায়। ধীরে ধীরে আগমন ঘটছে সমাজ থেকে ‘ছিটকে-পড়া’ নারীদের। তাদের পিছনে পিছনে ছুটছে কিছু কামাতুর-নেশাগ্রস্ত পুরুষ। এসব দৃশ্য দেখলে মনে হয় মানুষ যেন আদিমতা ছেড়ে এক পাও এগুতে পারেনি। কোন কোন সময় ধর্ষণের মত ঘটনাও ঘটে যায়। এরূপ ঘটনা থেকে উদ্ভূত কয়েকটা মামলা এখনো বিচারাধীন।
আমার গায়ের উপর অবৈধভাবে চেপে আছে বেশকিছু বস্তি-ঘর। বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকান্ডের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে সেগুলো। অনেকটা আদালত এবং প্রশাসনের কোলের উপর বসে চলছে এসব কর্মকান্ড। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় একটা প্রবাদ আছে ‘চেরাগর নীচদ্দি আঁধার থাহে।’ (বাতির নিচে অন্ধকার থাকে) চমৎকার যুতসই এই প্রবাদ।
মানুষের বিকৃত, আদিম ও প্রমত্তরূপ দেখতে দেখতে রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়ে আসে। মাঝে মাঝে কষ্ট পাই। মাঝে মাঝে রাগে ফুঁসতে থাকি। এত পাপ আর এত পঙ্কিলতার ভার আর সইতে পারছি না। ইচ্ছে করে সবকিছু নিয়ে ভূ-অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ি। কিন্ত মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের মত জড় বস্তুকে কিছু সীমাবদ্ধতার শিকলে আবদ্ধ রেখেছেন। এর বাইরে আমাদের যাওয়ার সুযোগ নেই। কিছু করারও এখতিয়ার নেই।
জৈবিকতা ও পাশবিকতার কাছে এসব মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে কোন কোন সময় করুনাও হয়। কারণ আমি জানি- ইহকাল ও পরকাল, উভয় জগতেই কত ভয়াবহ আর করুন পরিণতি অপেক্ষা করছে এসব মানুষের জন্য! ভাবতেই শিউরে উঠি!

হে প্রভু! আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ
চট্টগ্রাম শহরে ছোট বড় অনেক পাহাড় রয়েছে। মহান প্রভু কেন যে আমাকে প্রশাসন এবং আদালতের জন্য নিয়োজিত রেখেছেন, তার কোন উত্তর আমি খুঁজে পাইনি। খোঁজার চেষ্টাও করিনি সেভাবে। স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে বিনয়াবনত হয়ে আত্মসমর্পণ করেছি। এতে আমি সুখ পাই। এতেই আমার প্রকৃত আনন্দ। এতেই আমার সার্থকতা। মনে মনে প্রস্তুত থাকি- অজানা ভবিষ্যতে আমার সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে কাজে ব্যবহার করবেন সে কাজে আমি নিজেকে খুশি মনে বিলীন করে দেব।
আদালতের গোড়াপত্তন হওয়ার পর থেকে অগণিত মানব-মানবীর হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ ও সৌভাগ্য-দূর্ভাগ্য দেখার সুযোগ হয়েছে। কত মানুষের ভাগ্য বিপর্যয় হতে দেখেছি- তার কোন হিসেবে আমার জানা নেই। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আমাকে স্থবিরতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত আমার কোন দ্বিমত কিংবা অনুযোগ নেই। নেই কোন আক্ষেপ। তারপরও মাঝে মাঝে চলমান জীব দেখলে কেমন যেন মনে হয়। কিন্ত মহান প্রভু আমাকে যে বিচিত্র জ্ঞান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছেন তা ভেবে কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠে মন। বৈচিত্রময় পৃথিবীর সমস্ত রূপ যেন আমি দেখে ফেলেছি। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে ক্লান্তি চেপে ধরে আমাকে। নিজের অজান্তেই ঘুমের কাছে করি অসহায় আত্মসমর্পণ। এভাবেই শেষ হয়ে যাচ্ছে আমার প্রতিটি দিন।

লেখক– চীফ জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, বান্দরবান

(উল্লেখ্য, লেখাটি ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত। এবং সম্মানিত লেখক চট্টগ্রামে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১২ সালে লিখেছিলেন। লেখাটি ইতোপূর্বে বারের ম্যাগাজিনেও ছাপানো হয়েছিল।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm