মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে এবং জ্বালানির দামও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও এলপি গ্যাসের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। অন্যদিকে কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করে সরকার।
তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং সৌদি আরব ও কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনায় সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।
এদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যেখানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রায় ৬৭ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭৬ ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশের বাজারেও ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে জ্বালানি মজুতের অবস্থাও খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্যমতে, দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১৪ দিনের, পেট্রোলের ১৫ দিনের এবং অকটেনের ২৮ দিনের। ফার্নেস তেল মজুত আছে প্রায় ৯৩ দিনের এবং জেট ফুয়েল রয়েছে প্রায় ৫৫ দিনের। এলএনজি সংরক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় এ জ্বালানির কোনো বড় মজুত রাখা সম্ভব হয় না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেইন বলেন, বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানির বড় অংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। এই রুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে দেশের জ্বালানি খাতের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হবে। তিনি মনে করেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকা প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বর্তমান সরবরাহকারী দেশগুলোর কাছ থেকে সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ করা হবে এবং নতুন উৎসও খোঁজা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্প খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।