এক লাফে ভাড়া বাড়ল ৫ টাকা, কর্ণফুলীতে বিপাকে নদী পারাপারের যাত্রীরা

আনন্দ ও আশার বার্তা নিয়ে নতুন বছর শুরু হবে এমনটাই আশা থাকে সবার। তবে সেই আশা যেন পূরণ হয় না চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর বাসিন্দাদের। গত সোমবার পহেলা বৈশাখের দিন হঠাৎ করেই ৫ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয় মাতব্বার ঘাটের নদী পারাপারের ভাড়া। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের ১১ নম্বর মাতব্বার ঘাটের নদী পারাপাড়ের মানুষজন।

জানা গেছে,আগের দিন রোববার পর্যন্ত ঘাটের ভাড়া ছিল ১৫ টাকা। রাত পেরিয়ে ভোর হতেই সেই একই পথ পার হতে ভাড়া হয়ে যায় ২০ টাকা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘাট দিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, পটিয়াসহ কয়েকটি উপজেলার বিদেশযাত্রী, হজযাত্রী, ইপিজেডের কারখানার কয়েক লক্ষাধিক শ্রমিক বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের হাজারো চাকরিজীবী এবং বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নদী পারাপার করেন।

যাত্রীদের অভিযোগ, পারাপারের জন্য ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলো চালিত হচ্ছে অদক্ষ চালক দিয়ে। নদীতে যখন পানি বাড়ে তখন বোটে ৫০-৬০ জন মানুষ নিয়ে নদী পার হওয়া যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। নদীর পাড়েও যাত্রী ওঠানামায় রয়েছে নানা সমস্যা। ঘাটে ইজারাদাররা মানুষের তুলনায় প্রয়োজনীয় বোট না রাখায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সাধারণ যাত্রীদের। অন্য উপায় না থাকায় যাত্রীরাও চড়তে বাধ্য হন এসব বোটে। বিভিন্ন সময় ঘটে বোট ডুবিসহ নানান দুর্ঘটনা।

জানা যায়, কর্ণফুলী উপজেলার কোল ঘেঁষে নদী পর হয়ে চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াতের জন্য ২০টি ঘাট রয়েছে। ঘাটগুলো হলো রাঙাদিয়া ১৫নং ফেরিঘাট, সল্টগোলা ঘাট, বাংলাবাজার ঘাট, নয়ারাস্তা পাকা পুল ঘাট, সদরঘাট, ফিশারীঘাট, নতুন ঘাট, এয়াকুব নগর লইট্যা ঘাট, পতেঙ্গা ১৪নং ঘাট, গুচ্ছ গ্রাম ঘাট, ১১নং মাতব্বর ঘাট, ১২নং তিনটিংগা ঘাট, ৭নং রুবি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি সংলগ্ন ঘাট, ৯নং বি ও সি ঘাট, অভয়মিত্র ঘাট, চাক্তাই খালের পাশে পান ঘাট হতে গাইজ্জের ঘাট, পতেঙ্গা চাইনিজ ঘাট, বাকলিয়া ক্ষেতচর ঘাট, চাক্তাই ঘাট ও চাক্তাই ৫টি লবণঘাট। এসব ঘাটের ইজারা দেয় সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু ঘাটের কোন সংস্কার কাজ না করায় যাত্রীদের উঠানামায় বিভিন্ন সময় ঘটে দুর্ঘটনাও।

নিয়মিত নদীপারাপারে যাত্রী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, পয়লা বৈশাখ আনন্দঘন দিনটি কারখানার শ্রমিক, দিনমজুর, সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উৎসবের আমেজ নিয়ে হাজির হয় না। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ আসলে ঘাটের ভাড়া বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেন ঘাটের ইজারাদাররা। কয়েক বছর আগেও এ ঘাট দিয়ে ৬ টাকায় পার হয়েছি। এ ভাড়া বাড়তে-বাড়তে এখন ২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এসব নৈরাজ্য বন্ধ করা প্রয়োজন।

নদীর ওইপারে ইপিজেডের নারী শ্রমিক মিনু আকতার (২৮) বলেন, আমি প্রতিদিনই এ ঘাট যাতায়াত করি। আগে ১৫ টাকা ছিল, এখন ২০ টাকা দিতে হচ্ছে ভাড়া। মাস শেষে যে বেতনে চলি, তাতে ৫ টাকা করে বাড়তি খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

দিনমজুর মোহাম্মদ ইয়াছিনসহ একাধিক দিনমজুর এবং যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যদি এভাবে বাড়তেই থাকে ঘাটের ভাড়া। তাহলে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়বে। কর্তৃপক্ষের উচিত বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া। সাধারণ যাত্রী মোহাম্মদ একরাম নামে এক যুবক বলেন, যানবাহনের ভাড়া বাড়ছে, ঘাটেও বাড়ছে ভাড়া। অথচ আয় বাড়েনি। পরিবার নিয়ে কষ্টে আছি, কিছু বলার ভাষা নেই।

ঘাটে ৫টাকা বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে জুলধা লাইফবোট ও সাম্পান মাঝি মালিক সমবায় সমিতির সদস্য সালেহ আহমেদ লালু সওদাগর বলেন, আগে ঘাটে খাস কালেকশন হতো, এবার ইজারা হয়েছে। চসিকের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ইজারাদারের এখতিয়ার নেই তা পরিবর্তনের।

তিনি আরও বলেন, ঘাটের ইজারা দেয় সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু ঘাটের কোন সংস্কার কাজ করেন না তারা। এতে করে যাত্রীদের উঠানামায় বিভিন্ন সময় ঘটে দুর্ঘটনা। এছাড়াও দ্রুত ঘাটের সংস্কার এবং যাত্রীদের জন্য একটি নিরাপদ গণশৌচাগার নির্মাণের দাবীও জানান তিনি।

ইজারাদার প্রতিনিধি মোহাম্মদ ফারুক বলেন, জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও শ্রমিক খরচ বেড়েছে। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী ৫ টাকা বাড়িয়ে ভাড়া ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যাত্রীরা চাইলে আমরা চসিককে স্মারকলিপি দিয়ে ভাড়া পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাবো।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এ ঘাটে ‘খাস কালেকশন’ পদ্ধতি থাকলেও এবার ঘাটটি ভ্যাটসহ প্রায় ২ কোটি ২ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ঘাটের অপর ইজারাদার নেজাম উদ্দিন জানিয়েছেন, এই ইজারা ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার মূল্যে কার্যকর হয়েছে পহেলা বৈশাখ থেকে।

অন্যদিকে, চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এসএম সরওয়ার কামাল বলেন, ‘স্থানীয়দের অভিযোগ থাকলে সেটি লিখিতভাবে জানালে সিটি করপোরেশন বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। ইজারা শর্ত অনুযায়ী ২০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে জনগণের দাবির ভিত্তিতে মেয়রের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে।’

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।