‘বাপরে বাপ, কই গেলারে আঁরে ফেলাই? আল্লাহ, কী করলা তুমি আমারে? শেষ করে দিলা সব! আমার তো সব শেষ! সব শেষ, শেষ সব আমার!’ পাহাড় ধসে ছেলেকে হারিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন চট্টগ্রামের আনোয়ারার বৈরাগ ইউনিয়নের মৌলানা নুরুজ্জামান আলকাদেরী বাড়ির আবুদুর শুক্কুরের পুত্র মো. এমরান হোসেন। পঞ্চম শ্রেণীর শিশুপুত্র মোহাম্মদ মেজবাহকে (১১) হারিয়ে মূর্ছা যাচ্ছেন বাবা, এমরানের সঙ্গে কাঁদছে গ্রামবাসীও।
বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মৌলানা নুরুজ্জামান আলকাদেরী বাড়ি ও গনি মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এমন আহাজারি। তাদের আহাজারি ছুঁয়ে যাচ্ছিল আশেপাশে সবাইকেও। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরাও।
বুধবার রাতেও সাজানো-গোছানো সংসার ছিল, রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে তিন ছেলেকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন এমরান। এছাড়াও পাহাড় ধসে মারা যাওয়া অপরজন রোহান (১২) পাশ্ববর্তী এলাকার গনি মিয়ার বাড়ির আবদুর রহিমের ছেলে। সেও একই এলাকার একটি বিদ্যালয়ে ৬ষ্ট শ্রেণীর ছাত্র। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে সে সবার বড়। পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে প্রায় অজ্ঞান পিতা রহিম।
নিহতদের প্রতিবেশী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে পাহাড় কাটছে কেইপিজেড। সকালে তাদের সহপাঠীদের সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল তারা। কাটা ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়টি ধসে পড়লে মাটিচাপা পড়ে তারা। এমন মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছাড়া নেমে এসেছে। নিহতদের লাশ হাসপাতাল থেকে বাড়িতে এসে নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
এরআগে বৃহস্পতিবার (১ মে) সকালে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড) পাহাড়ের বৈরাগ অংশে খেলতে গিয়ে পাহাড় ধসে নিহত হন দুই শিশু ও আহত হন একই এলাকার মোস্তাক মিয়ার পুত্র মোহাম্মদ সিয়াম (১১) ও আবুল কাশেমের পুত্র মোহাম্মদ সিফাত (১১)। আহত দুইজনই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, কেইপিজেডে অব্যাহত পাহাড় কাটার ফলে বৈরাগ অংশের পাহাড়টির ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় শিশু কিশোররা বাড়ির পাশে পাহাড়ে খেলতে গেলে কাটা পাহাড়েরর বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে মাটিচাপায় প্রাণ হারান দুই শিশু। স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার করা হয় তাদের সঙ্গে থাকা অপর সহপাঠীদের।
এদিকে ঘটনার পর কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, দুর্ঘটনার স্থানটিতে অতি পুরাতন ও পরিত্যক্ত ভঙ্গুর খাড়া বালুর ঢিবি বিদ্যমান। এছাড়া স্থানটি নিরিবিল হওয়ায় সেই ভঙ্গুর বালুর টিলায় কিছু পরিযায়ী পাখি ও শিয়াল গর্ত করে বসবাস করে। দিনের বেলায় শিয়াল না থাকলেও পাখির গর্তে পাখি আসা-যাওয়া করে।
পাখি ধরতে আসা একদল কিশোর শিয়ালের গর্তটিকে কাঁচি দিয়ে বড় করার উদ্দেশ্যে মাটি সরাতে গেলে উপর থেকে মাটি ধসে পড়ে তারা মাটিচাপা পড়ে। বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়, দুর্ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য কুচক্রী মহল উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষকে দায়ী করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।