কোয়ালিটির পাশাপাশি মানবিক ডাক্তার তৈরি করতে হবে: স্বাস্থ্য উপদেষ্টা

স্বাস্থ ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেছেন, আমাদের চাওয়া সাধারণ মানুষ যেন মানসম্মত চিকিৎসা পায়। আর মানসম্মত ডাক্তার তৈরির জন্য মানসম্মত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। কোয়ালিটি ডাক্তার তৈরির পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে মানবিক ডাক্তার তৈরি করতে হবে।

শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) উপদেষ্টা চট্টগ্রাম মা ও শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের পরিচালনা পর্ষদ এবং বিভাগীয় প্রধানদের সাথে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন।

উপদেষ্টা বলেন, স্বাধীনতার এতো বছর পরেও ঢাকার বাইরে বড় কোন বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে উঠেনি। চক্ষু, নিউরো আর্থোপেডিক সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। অথচ বড় শহর হিসেবে চট্টগ্রামে এসব জাতীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা। কি কারনে হয়নি এসব সকলে জানে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল, জেনারেল হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার নার্স , চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও আধুনিক ল্যাবের অভাব রয়েছে। সুযোগ সুবিধা অপর্যাপ্ত। শুধু সরকারি পর্যায়ে ডাক্তারের সংকট রয়েছে দশ হাজারের মতো। বারো হাজারের বেশি নার্সের সংকট রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে সেবার পাশাপাশি কিছু কিছু ঔষধ ফ্রি দেওয়া হলেও অনেক ঔষধ ও ল্যাব সুবিধা আমরা রোগীদের এখনো বিনামূল্যে দিতে পারিনি। এটা লজ্জার ব্যাপার। আশার কথা হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার ডাক্তার নিয়োগের ব্যবস্থা হচ্ছে। পাশাপাশি সাড়ে ৩ হাজার নার্সও নিয়োগ দেওয়া হবে। ফলে ডাক্তার নার্স সংকট অনেকটা কেটে যাবে।

উপদেষ্টা বলেন, কিছুদিন পূর্বে জাপানের একটি টিম আমার কাছে এসেছিলো। তারা আমাদের থেকে নার্স ও কেয়ারগিভার নিতে চায়। এজন্য তারা আমাাদের হাসপাতালে সেসব বিষয়ে টেকনিক্যাল প্রশিক্ষন দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। সবকিছু জাপান করবে, আমরা শুধু তাদের সাপোর্ট দিবো। এক বছর মেয়াদে তারা নার্স ও কেয়ারগিভারদের লেভেল থ্রি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে জাপানে নিয়ে যাবে। এখনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেবে। পুরুষ ও মহিলা কেয়ারগিভার আধা-আধি নেবে। তিনি বলেন, নার্স নিয়োগে বড় বাধা হচ্ছে ভাষা। এজন্য নার্সদের ইংরেজি ভাষা ভালভাবে শেখানো হবে। পাশাপাশি জাপানী ভাষাও শেখানো হবে।

তিনি বলেন, পতেঙ্গায় আজকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল নির্মাণের স্থান পরিদর্শন করেছি। সেখানে এসব নার্স ও কেয়ারগিভারদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা হয়েছে, প্রশিক্ষণও হয়তো দেওয়া যাবে। উপদেষ্টা মা ও শিশু হাসপাতালকে এ সুবিধা গ্রহণ করার পরামর্শ দেন।

উপদেষ্টা বলেন, আমাদের সরকারি পর্যায়ে ৩৭টি ও বেসরকারি পর্যায়ে ৬৭টি মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান মানসম্মত নয়। তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ল্যাব ও মানসম্মত শিক্ষক নেই। তাই এসব প্রতিষ্ঠান থেকে দক্ষ ডাক্তার বের হতে পারছে না। কিন্তু সরকার কোয়ালিটির ব্যাপারে কোন আপোষ করবে না। তাই আমরা সরকারি বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটি ম্যাট্রিক্স করছি। যেসব প্রতিষ্ঠান ম্যাট্রিক্স এর নিচে পড়ে যাবে-সেসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করা হবে। শিক্ষার্থীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে মার্জ করা হবে। যদি ঐসব প্রতিষ্ঠান তারপরেও কোয়ালিটি অর্জন করতে না পারে-তাহলে সেসব প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হবে। কেননা আমরা কোন অবস্থাতেই চিকিৎসা সেবায় কোয়ালিটির ব্যাপারে আপোষ করবো না।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালকে অনেক পুরনো হাসপাতাল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতোদিন হলেও এ প্রতিষ্ঠান আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করতে না পারার বিষয়টি সুখকর নয়। যেকোন প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়, অন্যের উপর নির্ভরশীর হলে চলে না। উপদেষ্টা এ প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

জনাব নূরজাহান বেগম বলেন, বর্তমানে আমাদের সকলের জীবনে সততার খুব অভাব রয়েছে। এ সততা শুধু আর্থিক ক্ষেত্রে নয় বরং কাজ সেবা সময় ইনকাম- প্রভৃতি সবক্ষেত্রের। সততা নাই বলে আমরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছি, সমাজ অস্থির হয়ে পড়েছে, আমাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের অসহিষ্ণুতার প্রমাণ। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য মানুষ বিশেষ করে গরীবের জন্য উপকারী কাজ বেশি করে করতে হবে।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদ সভাপতি সৈয়দ মোর্শেদ হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মঞ্জুরুল ইসলাম, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি, সিভিল সার্জন ডা.জাহাঙ্গীর আলম, হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদের সহসভাপতি ডা. কামরুন নাহার দস্তগীর, আবদুল মান্নান রানা, যুগ্ম সম্পাদক জাহেদুল হাসান, দাতা সদস্য প্রকৌশলী জাবেদ আফসার চৌধুরীসহ সকল বিভাগীয় প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন।

পরে তিনি হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড ও জরুরি সেবাদান কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সকালে উপদেষ্টা নগরীর পতেঙ্গায় প্রস্তাবিত হাসপাতাল নির্মাণের স্থান পরিদর্শন করেন।

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।