চাকসু নির্বাচনে ‘এমফিল-পিএইচডি’ শিক্ষার্থীদের প্রার্থিতার সুযোগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) এর দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে নির্বাচনের জন্য নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে চবির স্নাতক-স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এমফিল ও পিএইচডি কোর্সে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদেরও প্রার্থিতার ও ভোটাধিকারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (১ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫৯তম সিন্ডিকেট সভায় এই নীতিমালা অনুমোদন করা হয়।
নীতিমালা প্রকাশের পরই এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার ও প্রার্থিতার সুযোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, চাকসুর গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করতে গিয়ে সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা হয়েছে।

তাদের দাবি, নীতিমালা প্রণয়নের সময় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, শুধুমাত্র স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু চূড়ান্ত গঠনতন্ত্রে এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা রাখা হয়েছে ৩০ বছর। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন—যেখানে সবাই একমত ছিলেন, সেখানে প্রশাসন কেন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করল? এবং কাদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবেই বিবেচিত। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্টের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা এবং সকল সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নিয়মিত শিক্ষার্থীই চাকসু নির্বাচনে ভোটদানের অধিকার রাখবেন। এমফিল ও পিএইচডিরত শিক্ষার্থীরা শুধু ভোট দিতে পারবে। এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীরা যেহেতু নিয়মিত শিক্ষার্থী, স্বাভাবিকভাবেই তাদের ভোটাধিকার রয়েছে।

এদিকে দেশের অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ডাকসু, রাকসু ও জাকসুর নীতিমালা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় স্নাতক কোর্সে ভর্তি এবং স্নাতকোত্তর/এমফিল বা অন্য কোনো কোর্সে অধ্যয়নরত, হলের আবাসিক বা সংযুক্ত ও সরাসরি পাঠদানের আওতাভুক্ত শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ৩০ বছরের কম বয়সী হতে হবে।

৩০ বছরের বেশি বয়সী বা যেকোনো কোর্সে অধ্যয়নরত যেমন : সান্ধ্যকালীন কোর্স, পেশাদার/নির্বাহী মাস্টার্স, পিএইচডি, ডিবিএ, ডিপ্লোমা, সার্টিফিকেট, ভাষা কোর্স ইত্যাদি শিক্ষার্থীরা ভোটার হতে পারবেন না।

চাকসুর নতুন নীতিমালার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে চবি ছাত্রদল সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন বলেন, এমফিল ও পিএইচডি গবেষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রেখে এবং বয়সসীমা ৩০ নির্ধারণ করে প্রশাসন কি কোনো বিশেষ সংগঠনের জন্য সুবিধা তৈরি করছে?

তিনি বলেন, এমন নিয়মে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ আছে। আমরা চাই, ছাত্রসমাজের প্রকৃত প্রতিনিধিরাই নির্বাচনে অংশ নিক পক্ষপাত নয়, ন্যায্যতার ভিত্তিতে। চাকসু হোক ছাত্রসমাজের, কোনো গোষ্ঠীর নয়।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান বলেন, সিন্ডিকেটে যে গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হওয়া মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেছে। সেখানে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কথা থাকলেও, নতুন গঠনতন্ত্রে এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদেরও সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং বয়সসীমা ৩০ বছর রাখা হয়েছে। সব শিক্ষার্থী একমত থাকার পরও প্রশাসন কাদের সন্তুষ্ট করতে এমন সিদ্ধান্ত নিল, তা জানা দরকার।

ছাত্রশিবির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়া এবং বয়সসীমা ৩০ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এতে অর্ডিন্যান্স ভঙ্গ হয়নি, আবার শিক্ষার্থীদের উদ্বেগও দূর হয়েছে। নিয়মিত কোনো শিক্ষার্থী দাবি করলে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সুযোগ দিতে বাধ্য। আমরা আগেই নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সদস্যপদের পক্ষে মত দিয়েছি। এখন সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলেই ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

চবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন বলেন, মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রামে অধ্যয়নরতরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের আইন অনুসরণ করে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পর আমরা নিশ্চিত হয়েছি, নিয়মিত সব শিক্ষার্থীই ভোট দিতে পারবে। এমফিল ও পিএইচডির শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত শিক্ষার্থী, তাই তাদের ভোটাধিকার রয়েছে। তবে তারা প্রার্থী হতে পারবে না এজন্যই সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের সব দাবি মানা সম্ভব নয়। যেমন, উপাচার্য নির্বাচনকালীন ক্যাম্পাসে থাকতে পারবে না এমন দাবি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

নীতিমালা অনুযায়ী, কেবল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ও আবাসিক হলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরাই ভোটার ও প্রার্থী হতে পারবেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে যারা স্নাতক, মাস্টার্স, এমফিল অথবা পিএইচডি কোর্সে অধ্যয়নরত এবং আবাসিক হলের সঙ্গে যুক্ত, তারাই অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।

আগের নীতিমালায় চাকসুতে মোট পদসংখ্যা ছিল ১৮টি এবং নির্বাহী সদস্য ছিলেন ১০ জন। নতুন কাঠামোতে মোট পদসংখ্যা ২৮টি এবং নির্বাহী সদস্য সংখ্যা কমিয়ে ৫ জন করা হয়েছে।

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।