ছায়াশীতল সবুজ বনের গরীবুল্লাহ শাহ কবরস্থান এখন—‘ধু ধু মরুভূমি’

১২ আউলিয়ার পূণ্যভূমি চট্টগ্রাম, তাঁদের একজন হযরত খাজা গরীবুল্লাহ শাহ (র.)। তাঁর মাজার কমপ্লেক্সে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, মাদ্রাসা। পাশেই নগরীর অন্যতম বৃহৎ কবরস্থান।
মসজিদ, মাজার, মাদ্রাসা, পুকুর ও কবরস্থান মিলে মোট জায়গার পরিমাণ ৭ দশমিক ১৬ একর। এই বৃহৎ জায়গার বড় অংশই ছিল দেশীয় নানা জাতের গাছে ঢাকা ঘন বন। যা গত কয়েক মাসে কেটে উজাড় করা হয়েছে। গাছ কেটেছেন মাজার কর্তৃপক্ষ।

নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে গাছ কাটার বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম খবরকে মাজার কমপ্লেক্স কর্মকর্তা আবু বক্কর বলেন, আমার পূর্ব পুরুষ এই সম্পত্তি ওয়াকফ করে গেছেন। এক সময় আশপাশের পাড়া মহল্লার মানুষকে কবরস্থ করা হলেও এখন পুরো নগর এমনকি নগরীর বাইরের মানুষকে এখানে কবর দেওয়া হয়। আর এখানে কবর দেওয়ার জন্য কোনো টাকা-পয়সা নেয়া হয় না। কবরস্থানটি ঘন জঙ্গলে রূপ নেয়ায় রাস্তায় ছিনতাই করে, বিভিন্ন অপরাধ করে অপরাধীরা দৌঁড়ে এসে এখানে আশ্রয় নেয়। এছাড়া গাঁজা সেবনকারীদের একটি অংশও এখানে আড্ডা জমায়। সেজন্য আমরা পরিষ্কার করেছি।

ছায়াশীতল সবুজ বনের গরীবুল্লাহ শাহ কবরস্থান এখন—‘ধু ধু মরুভূমি’ 1

বড় গাছগুলো রেখে ঝোপ পরিষ্কার করা যেতো কিনা জানাতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে বেশী গাছ ছিল না। ৫০ থেকে ৬০টি গাছ ছিল। আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে কিন্তু গাছ কাটিনি। আমরা কবরস্থানের সৌন্দর্য বাড়াতে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। ওয়াক-ওয়ে নির্মাণ হচ্ছে। মানুষ এখন নিয়মিত কবর জিয়ারত করছে। দিনের মতো রাতেও এখানে আলো থাকবে। কোনো অপরাধী এখানে আশ্রয় নিতে পারবে না।

ছায়াশীতল সবুজ বনের গরীবুল্লাহ শাহ কবরস্থান এখন—‘ধু ধু মরুভূমি’ 2
গাছ কাটার আগের ছবি

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ মার্চ গাছ কাটার সংবাদে সেখানে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসনের দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাজহারুল ইসলাম ও আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়ম অনুযায়ী হাতে নাতে কাউকে না পাওয়ায় তাঁরা কোনো সাজা দিতে পারেননি। কিন্তু বনবিভাগকে থানায় মামলা দায়ের করতে নির্দেশ দেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আগ্রাবাদ সার্কেলের এসি ল্যান্ড আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম বলেন, কবরস্থান ও পাহাড়ের গাছ কাটার খবর পেয়ে মাননীয় জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে আমরা সেখানে অভিযান পরিচালনা করি। সেখানে মোট ২১৪ ঘনফুট গাছ জব্দ করেছি। পরে গাছগুলোর জব্দ করে বনবিভাগে বুঝিয়ে দেয়েছি। বনবিভাগকে থানায় নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ দিয়েছি।

ছায়াশীতল সবুজ বনের গরীবুল্লাহ শাহ কবরস্থান এখন—‘ধু ধু মরুভূমি’ 3
গাছ কাটার পরের ছবি

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে বনবিভাগ থানায় মামলা দায়ের করেছে। মামলার বাদী চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মালেক। আর মামলায় আসামী করা হয়েছে—‘অজ্ঞাত চোরদের’। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে—২৫ মার্চ সরেজমিনে গিয়ে ১০/১৫টি গাছের মোথা, ৬০টি গাছের টুকরো যা ২১৪ ঘনফুট গাছ (যার মূল্য ৫৩ হাজার ৫০০ টাকা) জব্দ করা হয়। একই দিন ওমরগনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থানে অভিযান পরিচালনা করার কথা মামলায় উল্লেখ আছে। তবে জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থানে ১০/১৫টা গাছের মোথা পাওয়ার কথা উল্লেখ করলেও গাছ জব্দ করতে পারেনি বা কোনো কিছু পাওয়া যায়নি।

কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়ে গাছ কাটার পরও অজ্ঞাত চোরদের ঘাড়ে দায় দিয়ে মামলা করেছে বনবিভাগ। এবিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম কায়সার বলেন, সরকারি খাস জায়গার গাছ কেউ কেটে নিয়ে গেছে। তাই অজ্ঞাত অসামীদের নামে মামলা হয়েছে।

ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনার জন্য কমিটি রয়েছে এবং কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে গাছ কেটেছে বিষয়টি বন কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনি বলেন—পুলিশ তদন্ত করে বের করুক।

গাছ কাটার নিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে এসএম কায়সার বলেন, কেউ গাছ কাটতে চাইলে আমাদের কাছে লিখিত আবেদন দিবেন। আমরা জেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় সেটি উত্থাপন করবো। ডিসি মহোদয় অনুমতি দিলে আমরা গাছ কাটার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অনুমতি দিতে পারি।

নগরীর বুকে কয়েক একর বনভূমি বিরান হওয়া প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, বনভূমি রক্ষা এবং নতুন বনভূমি সৃজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। গাছ কাটার বিষয়ে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। কিন্তু ভ্রাম্যমান আদালতেরও সীমাবদ্ধা রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত হাতে নাতে অপরাধীকে পেলে সাজা দিতে পারে না। হাতে নাতে অপরাধী না পেয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বয় বনবিভাগকে মামলার নির্দেশ দিয়েছে। তারা যদি অজ্ঞাত ব্যক্তিদের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দেয় সেটির জবাব তারা দিবেন।

ছায়াশীতল সবুজ বনের গরীবুল্লাহ শাহ কবরস্থান এখন—‘ধু ধু মরুভূমি’ 4

মামলার এজাহার দেখে চট্টগ্রাম নগর পুলিশে কর্মরত একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, মাজার পরিচালনায় প্রভাবশালীরা জড়িত। এখন বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? বনবিভাগ সব জেনে শুনে পুলিশের কোর্টে বলটা পাঠিয়ে দিয়েছে। মামলার কোনো সুফল যেন না আসে সব রকম দুর্বলতা বনবিভাগ এজাহারে রেখেছে।

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।