বনের হাতি বনে ফেরাতে সড়কে বিক্ষোভ, ঈদে ঘরমুখী মানুষের দুর্ভোগ

বনের হাতি বনে ফেরাতে এক সপ্তাহের মধ্যে দুইবার সড়ক অবরোধ করেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার হাজারও এলাকাবাসী। ৭ বছর ধরে দেয়াঙ পাহাড়ে অবস্থান নেওয়া বন্যহাতি অপ্রসারণের দাবিতে আবারও সড়ক অবরোধ করলে প্রায় আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে লেগে যায় দীর্ঘ যানজট। এতে দীর্ঘ প্রায় ৫ ঘন্টা দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, পেকুয়া, কক্সাবাজারসহ কর্ণফুলী টানেলের কয়েক হাজার গাড়ি আটকা পড়ে। ভোগান্তিতে পড়ে ঈদে ঘরমুখী মানুষ।

বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) সকাল ৬টা থেকে ‘আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার সাধারণ জনগণ’-এর ব্যানারে পিএবি সড়কের কেইপিজেড ফটক, কেইপিজেডের আনোয়ারার জাইল্লা ঘাটাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে এ কর্মসূচি শুরু হয়। সকাল সাড়ে ৬টার সময় কেইপিজেডের দৌলতপুর, সিইউএফএল সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। ওই সময় কেইপিজেডের শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীরা আটকা পড়েন। এর বাইরে পিএবি সড়কের প্রধান সড়ক আটকে দেওয়ায় যাত্রীরা আটকে পড়েন।

সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কেইপিজেডের নিরাপত্তাকর্মীরা বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছেন। আর পিএবি সড়কের চার কিলোমিটার জায়গাজুড়ে গাছের গুঁড়ি ও পাথরের বক্ল দিয়ে অবরোধ করা হয়েছে। প্রায় ৫ ঘন্টাপর বাংলাদেশ সেনাবাহির হস্তক্ষেপে সড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেয় আন্দোলনকারীরা। এতে স্বত্বি ফিরে সড়কে আটকে থাকা দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েক হাজার মানুষের।

সম্প্রতি যেসব এলাকা গুলোতে হাতি আসছে, আগে কখনও এমন বিচরণ দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। হঠাৎ হাতির মুখোমুখি হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিনই পাহাড় থেকে বন্যহাতির দল গ্রামবাসীর জমির ফসল, ঘর-বাড়ি ও গাছ-পালার ক্ষতি করছে। গত ৭ বছর পাঁচটি হাতি আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছে। হাতিগুলো কখনও দিনে আবার কখনও রাতে লোকালয়ে নেমে আসে। ওই এলাকা থেকে হাতি সরিয়ে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বনবিভাগও। এতে জানমালের ক্ষয়-ক্ষতি বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

জানা গেছে, দেয়াঙ পাহাড়ের আশপাশের এলাকায় গত ৭ বছরে হাতির আক্রমণে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে উপজেলার বড়উঠানের শাহমীরপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের টেনরুলের বাপের বাড়ি এলাকায় হাতির শুঁড়ের আঘাতে প্রাণ হারায় ৭ মাসের শিশু মো. আরমান জাওয়াদ। হাতির আক্রমণে শিশুটির মা খজিমা বেগম (৩৭) গুরুতর আহত হাসপাতালের মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

চট্টগ্রাম শহরমুখী একাধিক সাধারণ মানুষ বলেন, ঈদের আগে সড়কে দুভোর্গ সৃষ্টি করে অবরোধ কেউ কাম্য করে না। আমরাও চাই বনের হাতি বনে ফিরিয়ে নেওয়া হোক। হাতির কাছ থেকে রক্ষা হোক মানুষের জানমাল।

আন্দোলনকারী স্থানীয় বাসিন্দা জাবেদুল ইসলাম বলেন, গত শনিবার হাতি অপ্রাসারণের দাবীতে আমরা সড়ক অবরোধ করলে প্রশাসন চারদিনের মধ্যে সমাধানের আশ্বাস দেন। কিন্তু এসময়ের মধ্যে কোনো সুরাহা দিতে না পারায় আমরা আবারও আন্দোলনে নেমেছি। ঈদে ঘরমুখি মানুষের কথা চিন্তা করে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আশ্বাসে আজ আবারও অবরোধ প্রত্যাহার করি আমরা।

কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (কেইপিজেড) সহকারী মহাব্যবস্থাপক মুশফিকুর রহমান বলেন, আমরা বুঝতেছি না কেন কেইপিজেডকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। আমরাও চাই হাতি সরিয়ে নেওয়া হোক। হাতির আক্রমণে কেইপিজেডের বিভিন্ন স্থাপনা প্রতিনিয়ত ক্ষতি হচ্ছে।

কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শরীফ বলেন, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধ তুলে নিয়েছে। বর্তমানে যানচলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে সেদিকেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এদিকে বন বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বন অধিদপ্তর থেকে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছিল ইআরটি সদস্য না থাকলে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে। এ ছাড়া সেখানে প্রতিনিয়ত পাহাড় ও বনাঞ্চল কাটা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়। ঘটনার কিছুদিন আগে একই এলাকায় দোকানে বিদ্যুতের কেবল্ দিয়ে রেখেছিল, যাতে হাতি এলে শক খায়। শুক্রবার রাতে ওই এলাকার মানুষ বনে আগুন দিয়ে হাতিকে বিরক্ত করেছে। ফলে হাতি বেশি উত্তেজিত হয়, যার ফলে আক্রমণে শিশুটির মৃত্যু হয়।

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসস্থল তৈরি করতে গিয়ে কক্সবাজারে হাতির অভয়ারণ্য এলাকার বন-জঙ্গল নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। ফলে চট্টগ্রামের আনোয়ারা-কর্ণফুলী, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে গত ৭ বছর আগে চট্টগ্রামের আনোয়ারা-কর্ণফুলী দেয়াঙ পাহাড়ে আসে একটি হাতির পাল। ৫টি হাতির দলটি দিনে জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়ে থাকলেও রাত নামতেই খাবারের খোঁজে তারা হানা দিচ্ছে লোকালয়ে। রাতভর তান্ডব চালিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই হাতির পাল ঢুকে পড়ে জঙ্গলে। সামনে কাউকে পেলেই করে আক্রমণ।

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।