বান্দরবানে ঝিরি-ঝর্ণা শুকিয়ে হুমকির মুখে জীব বৈচিত্র্য

0

বান্দরবানে ঝিরি-ঝর্ণা শুকিয়ে হুমকির মুখে পড়ছে জীব বৈচিত্র্য। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করা না হলে সেখানে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

সরেজমিনে বান্দরবানের রূপালী ঝর্ণা, বাদুরা ঝর্ণা, সাইংগ্যা ঝিরি,সিদ্দিক নগর ঝিরি, লামিপাড়া ঝিরি, শৈল প্রপাত ঝিরিসহ বিভিন্ন ঝিড়ি ঝর্ণা ঘুরে দেখা যায়, ঝিরি ঝর্ণাগুলো সব প্রায় পানি শুন্য।

তীব্র পানি সংকটে ঝিরি ও ঝর্ণার আশে পাশে বসবাস করা জনগোষ্ঠীরা। ঝিরিতে ছোট ছোট কুপ করে অল্প পানি সংগ্রহ করে পানি সংকট নিবারণের চেষ্টা করছে স্থানীয়রা।

ঝিরি ঝর্ণা শুকিয়ে যাওয়ায় পাহাড়ে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আমিষের জোগান দাতা বিভিন্ন ছোট বাড় মাছ, শামুক ও কাকড়া ইত্যাদি আগেরমত পাওয়া যায় না। সুপেয় পানির চরম সংকটেও ভুগছেন তারা। ফলে পুষ্টি সংকটও প্রকট আকার ধারণ করছে।

বান্দরবানে ঝিরি-ঝর্ণা শুকিয়ে হুমকির মুখে জীব বৈচিত্র্য 1

বান্দরবানে অবাধে পাথর উত্তোলন, জোত পারমিটের নামে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনকে এর জন্য দায়ী করছেন স্থানীয়রা।

সিদ্দীক নগর এলাকায় বসবাসকারী শিক্ষার্থী সুজন জানান, এলাকায় দুটি ঝিরি ছিল। যেখান থেকে স্থানীরা পানি, মাছ ও কাকড়াসহ বিভিন্ন প্রকার খাবার উপযোগী জলজ প্রাণি সংগ্রহ করত। এছাড়া এলাকাগুলোতে হরিন, বন্য শুকর, বানর, বনমোরগসহ নানা প্রজাতির বন্য প্রাণির অবাধ বিচরণ ছিল। এখন এসব আর দেখা যায় না। পাহাড় থেকে অবাধে পাথর উত্তোলন ও নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে ঝিরিঝর্ণা গুলো শুকিয়ে গেছে। জলজ প্রাণি সংগ্রহ দুরের কথা, পানীয় জল সংগ্রহ করা অনেক কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।

বান্দরবানে ঝিরি-ঝর্ণা শুকিয়ে হুমকির মুখে জীব বৈচিত্র্য 2

লাইমি পাড়ার ফ্লোরা বম জানান, লাইমি পাড়ায় বাসবাসকারীদের একমাত্র পানির উৎস লাইমি পাড়া ঝিরি। আগে ঝিরি থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেলেও এখন তেমন পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবার পরিজন নিয়ে চরম পানি কষ্টে আছেন তারা। একসময় প্রয়োজনীয় আমিষের যোগানও দিত এই ঝিরি। পাওয়া যেত কাকড়া, শামুক, মাছসহ নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী। ঝিরি শুকিয়ে যাওয়ায় খাবার পানিও তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। পানি সংগ্রহের জন্য ঝিরিতে রিং ওয়েল বসিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।

শৈলপ্রপাত এলাকার ডাংলিয়াম বম জানান, এখানে কয়েকশ পরিবারের বসবাস। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় নলকূপ বা ডিপ টিউবওয়েল বসানোর কোন সুযোগ নেই এখানে। পানির জন্য ঝিরিই একমাত্র ভরসা। এখানে বসবাসরত অধিকাংশ জনগণ নিম্ন আয়ের হওয়ায় আমিষের জন্য ঝিরি, প্রোটিনের জন্য পাহাড়ের বন্য প্রানীই তাদের একমাত্র ভরসা। যেখানে পাথর আছে সেখানে একটু আধটু পানি আছে।

বান্দরবানে ঝিরি-ঝর্ণা শুকিয়ে হুমকির মুখে জীব বৈচিত্র্য 3

সুয়ালক এলাকার পারভিন আক্তার মুন্নি জানান, আগে বাড়ির পার্শ্বে বসানো রিংওয়েলটি পরিপূর্ণ থাকতো পানিতে। গত বছর দুয়েক ধরে রিংওয়েল দুরে থাক ঝিরিতে এসে ছোট ছোট কুপ করে মগ কেটে পানি নিয়ে কলশি পুরাতে অনেক কষ্ট হয়।

রূপালী ঝরণা এলাকার জাফর আহমেদসহ কয়েকজন স্থানীরা জানান, রূপালী ঝর্ণাকে ঘিরে এলাকায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য তিনি অস্থায়ী দোকান গড়ে তুলেছেন। দোকান থেকে সংসার চলে তার। ঝর্ণা দেখতে প্রতিদিন অনেক পর্যটক আসে। এভাবে ঝর্ণার ফোয়ারা শুকিয়ে গেলে রূপালী ঝর্ণা পর্যটক শূন্য হয়ে যাওয়া আশঙ্কা করছেন তিনি।

জাফর আহমেদ বলেন, আগে ঝর্ণার ফোয়ারা ছিল অনেক বেশী। দিন যত যাচ্ছে পানির ফোয়ারা ততই কমছে। ঝিরির নিচে কুপটি পরিপূর্ণ থাকত পানিতে। পাওয়া যেত মাছ, কাকড়া, শামুক ঝিনুকসহ নানা জলজ প্রাণি। পানি শুকিয়ে যাওয়ায় কোনকিছুই পাওয়া যায় না এখন।

সাংবাদিক তপন চক্রবর্তী জানান, ঝিরি ঝর্ণা পানিশূন্য হওয়ার পেছনে জুম চাষের জন্য জঙ্গল পরিষ্কারের নামে পাহাড়ে আগুন দিয়ে গুল্ম থেকে বিভিন্ন গাছ গাছালী পোড়ানো, কলা গাছ নিধন, ব্যবসায়ীক স্বার্থে জোত পারমিটের নামে নির্বিচারে বন উজাড় করা কম দায়ী নয়।

বান্দরবানে ঝিরি-ঝর্ণা শুকিয়ে হুমকির মুখে জীব বৈচিত্র্য 4

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন বান্দরবান চ্যাপ্টার এর সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে ঝিরি ঝর্ণা ও নদ-নদী পানি শুন্য হওয়ার কারন মনে করলেও, মানুষ সৃষ্ট সমস্যাগুলো এর অন্যতম কারন। পাথরকে পাহাড়ের প্রাণ হিসেবে বিবেচনা হলে, গাছকে সঞ্চালন কারী হিসেবে আখ্যা করা হয়। প্রচলিত আছে ভূগর্ভস্থ পানিরস্তর হতে সর্বনিন্ম ১০০ ফুট গভীর হতে পানি শোষণের ক্ষমতা রাখে পাথর। গাছের মূল সেই পানিকে নিজে শোষণের পাশাপাশি মাটির বিভিন্নস্থরে সঞ্চার করে। প্রান (পাথর)-সঞ্চালন (গাছ) না থাকলে নির্জীব মরুভূমি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। উন্নয়নের নামে অবাদে পাথর উত্তোলন, জোত পারমিটের নামে বৃক্ষ নিধন ঝিড়ি ঝর্ণা শুকিয়ে যাবার অন্যতম কারণ।

বান্দরবানে ঝিরি-ঝর্ণা শুকিয়ে হুমকির মুখে জীব বৈচিত্র্য 5

আগে পাহাড়ে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীরা আমিষের জোগান পেত ঝিরি ঝর্ণার বিভিন্ন জলজ প্রাণি থেকে, প্রোটিনের জোগান পেত পাহাড়ের বিভিন্ন বন্য প্রাণি হতে। ঝিরি ঝর্নাতে পানি না থাকায় নেই তেমন জলজ প্রানী, বৃক্ষনিধনের ফলে বন না থাকায় বন্য প্রাণিও তেমনি প্রায় শূন্যের কোটায়। নদ-নদীতে যেখানে সামান্যতম পানি আছে তাও তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক, মাছ মারতে মশক নিধন তেল, বিষ প্রয়োগ ও বৈদ্যুতিক শর্ট দিয়ে মাছ শিকার করতে গিয়ে নিধন হচ্ছে মাছের রেণুসহ বিভিন্ন প্রকার জলজ প্রানী। এই কর্মকাণ্ড বা ধ্বংস যজ্ঞ থামানো না গেলে ভবিষ্যতে চরম হুমকিতে পড়বে বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলার জীববৈচিত্র।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm