শাটলে জমা ভালোবাসা

0

‘শাটল ট্রেন’ মানেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণস্পন্দন। দেশেতো বটেই পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যার শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিশেষ ট্রেনে যাতায়াতের ব্যবস্থা। আর ঝিকঝিক, ঝিকঝিক শব্দের তালে তালে- মন শুধু মন ছুঁয়েছে, মন কি যে চায় বলো, যারে দেখি লাগে ভালো, আলাল ও দুলাল- এ ধরনের হাজারো গান গেয়ে জীবনের সোনালী সময় পার করার ইতিহাস রয়েছে চবি শিক্ষার্থীদের।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন অথচ বন্ধুদের সাথে শাটলে গান গাওয়ার স্মৃতি নেই এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা শূন্য। একদম গলা ছেড়ে না গাইলেও আনমনে ঠোঁট মিলিয়েছেন সকলেই!
সাবেক চবিয়ানদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিচারণের কথা জিজ্ঞেস করলেই অকপটে বলছেন- শাটলের কথা। শাটলকে ঘিরে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অম্ল-মধুর হাজারো স্মৃতি!

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শাটলে কারো অভিজ্ঞতা তিক্ত হলেও দিনশেষে সমস্ত দুঃখ কষ্টকে ছাপিয়ে গিয়ে শাটলে জমা ভালোবাসায় প্রকট।

চট্টগ্রাম খবরের সাথে আলাপে শাটলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকেই তুলে ধরেছেন শিক্ষা জীবনের নানান স্মৃতি কথা।

শাটলে জমা ভালোবাসা 1

কথা হয় চবির সাবেক শিক্ষার্থী হানিফা নাজিব হেনার সাথে। বর্তমানে তিনি সফল নারী উদ্যোক্তা। তিনি জানালেন, শাটলে উঠতে গিয়ে তার পথ হারানোর গল্প। হেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটলে না উঠে, উঠে গিয়েছিলেন দোহাজারীগামী ট্রেনে। ট্রেনের উল্টো যাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ে না পৌঁছে চলে গিয়েছিলেন ভেঙ্গুরা। সাক্ষাত পেয়েছিলেন বাক প্রতিবন্ধী দর্জিসহ অজ্ঞাত নাছোড়বান্দার। কোন মতে নগরগামী বাসে উঠেন। নাছোড়বান্দা-কে ফাঁকি দিয়ে বাস থেকে নেমে পড়েন নগরীর জিইসি কামাল স্টোরের সামনে। অবশেষে সকালের উল্টো যাত্রায় ঘরে ফিরেছেন সন্ধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক স্মৃতি ঝাপসা হলেও শাটল ভেবে দোহাজারী ট্রেনে উল্টো যাত্রা স্মৃতির পাতায় এখনও উজ্জ্বল। উল্টো যাত্রা করে শাটলের প্রতি তার ভালোবাসা আরও কয়েকগুন বেড়ে গিয়েছিল।

সব ভোলা যায়, যায় না ভোলা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি। এর মধ্যে স্মৃতিতে শাটল যেনো এক ভিন্ন অনুভূতির নাম। শাটলেই জন্মদিন পালনের স্মৃতি রয়েছে রবিউল আলম রোমানের। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক। বর্তমানে পিএইচডি গবেষনায় অবস্থান করছেন জাপানে। তিনি বলেন, ২০১২ সালে বন্ধুরা শাটলে আমার জন্মদিনের আয়োজন করে। শাটলের সে মুহূর্তটি কখনও ভোলার নয়। জীবনে কখনো সুযোগ পেলে শাটলে আবারও বন্ধুদের নিয়ে জন্ম উৎসব পালন করবো।

শাটলে জমা ভালোবাসা 2

মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত সাবেক চবিয়ান মো. রুবেল বলেন, ‘শাটলের স্মৃতি এখনো আমাকে তাড়া করে। আমি বন্ধুদলের সাথে শাটলে যেতাম। শাটলে বন্ধুদের সাথে গান, আড্ডায় মেতে থাকতাম।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরন্তপনাও শাটলের শিডিউলের কাছে হার মানে। চলন্ত ট্রেন ছুটে চলছে আড্ডাবাজ ছেলেটা দৌঁড়াচ্ছে শাটল ধরতে-এমন দৃশ্য সেই তখন থেকে এখনো চলমান। সাড়ে সাতটার ট্রেনে ক্যাম্পাস যেতে ৬টা ৪৫ মিনিটে এসেও বসার সিট না পাওয়ার অভিজ্ঞতার দেখাও মিলে শাটলে। আসন ভরাট হয়েছে সাড়ে ৬ টায়। তবে আসনে মানুষ নেই। মানুষের বদলে আছে কতগুলো ব্যাগ, কাগজের টুকরো বা পাথরের টুকরো। হ্যাঁ, এগুলো শাটলের প্রতীকী চবিয়ান। আর এ প্রতীকী শিক্ষার্থীর দেখা একমাত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটলেই মেলে! এমন অভিজ্ঞতার কথা জানালেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আব্বাস। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, চলন্ত শাটলে দৌঁড়ে উঠার অভিজ্ঞতা হয়েছে বেশ কয়েকবার। আমি একা নয় আমরা পুরো বন্ধুদল দৌঁড়ে শাটলে উঠেছি। শাটল ছাড়ার আগে এসেও আসন পাইনি অনেক দিন। একবার এসে দেখি কয়েকটি পাথরের টুকরো আসনে। আমি পাথরের টুকরো ভেবে একটি টুকরো ফেলে বসলাম। ট্রেন আসার আগে পাথরের টুকরোর মালিক হাজির। বললো- ওটা আমার আসন, ‘ওঠো।’

শাটলে জমা ভালোবাসা 3

শাটলের দুপ্রান্তে বাজছে হাতের ঢোল। যদিও ঢোল নেই। শাটলের বডিই ঢোল। আর সম্মিলিত কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে বেড়াচ্ছে শাটলের বগি জুড়ে। এ সুখের দেখাও মেলে শাটলেই। শাটল মানেই যেনো হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখের এক মেলবন্ধন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আকিব আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা মনে পড়লেই হাতটা নড়েচড়ে ওঠে। মন চায় আবার শাটলে বাজাই। আমি বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে শাটলে বাজাতাম। গলা ছেড়ে গান গাইতাম বলেই গাইলেন, আমি একটা পাতার ছবি আঁকি, পাতাটা গাছ হয়ে যায়, মাথা ভরা সবুজ কচি পাতায়, গাছটাকে ছাতা মনে হয়।

শাটলের ছাদে চড়ারও অভিজ্ঞতা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের। খোলা আকাশ আর বাতাসের ছোঁয়ায় প্রাকৃতিক দৃশ্যের দেখা মেলে শাটলের ছাদ যাত্রায়। গান তো লেগেই থাকে বন্ধুদের কণ্ঠে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সুমিত বড়ুয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরো দমে ক্লাস চলাকালে শাটলের ভেতরে দাঁড়ানোর জায়গাও পাওয়া যেতো না। আর তখন আমরা শাটলের ছাদে যেতাম, গান গাইতাম। সোনালী সে দিনে ফিরতে মন আবার চায়। মন চায় মেতে উঠি ছেলেমিপনায়।

শাটলে জমা ভালোবাসা 4

শাটলে প্রেম হয়েছে এমন শিক্ষার্থীও রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইরিতা (ছদ্মনাম) শাটলে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রিয়ালকে (ছদ্মনাম) প্রপোজ করে ছিলেন- আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। তখন শাটল ছুটে চলছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে ষোলশহরের দিকে। সময়টা ছিলো গ্রীষ্মকালের পড়ন্ত বিকেল। ইরিতা হিন্দু, রিয়াল ছিলো বড়ুয়া। হয়তো এ কারণে দুজনের ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরে ইরিতার বিয়ে হয় নিজ ধর্মের এক ছেলের সাথে। রিয়াল তার বন্ধুদের নিয়ে ইরিতার বিয়েতে যোগ দেয়।

সেই ইরিতা চট্টগ্রাম খবরকে বলেন, রিয়ালকে শাটলে দেখেই আমার ভালো লেগেছিলো। তাই আমি রিয়ালকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। রিয়াল চায়নি বলে হয়নি। আমি এখন স্বামীর সাথে বেশ আছি। শাটলের এ স্মৃতিটুকু মনে পড়লে মনে মনে হাসি। রিয়াল হ্যা বললে আজকে হয়তো প্রেম-সাফল্যের গল্প শোনাতাম।

সদূর ফিনল্যান্ডে শাটলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কাঁদলেন শাওন বড়ুয়া তিনি ফিনল্যান্ডের তামপেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। শাওন জানান- অনার্স ৩য় বর্ষে শাটলে চড়ার চেয়েও তার (প্রেয়সী) জন্য চবি স্টেশনে অপেক্ষার বিষয়টি ছিল মুখ্য। শাটলে করেই প্রিয় মানুষটি আসত, আজ সে কথা ভেবে স্মৃতিতে আঁচড় কাটছে। বিকেলে শাটল ছাড়ার আগে যেটুকু ফ্রি সময় থাকতো তখন তাকে বিদায় জানানোর আগে স্টেশন এলাকায় একান্তে বসে মান অভিমানের পালা চর্চা করতাম। এ জীবনে আর তার হাত ধরা, তাকে কাছে পাওয়া হয়নি কখনো। জীবনস্রোত আমার থেকে তাকে অনেক দূরে নিয়ে গেলেও সে সব সময় আমার শাটলট্রেনের গল্পের নায়িকা হয়েই থাকবে। আজ আর কোনো অভিমান নেই, নেই কোনো অভিযোগ। আছে শুধু প্রাণঢালা শুভকামনা। ভালো থাকুক, ভালবাসার মানুষ।

শাটলে জমা ভালোবাসা 5

এছাড়াও মন দেওয়া-নেওয়ার কত কাব্য চবির শাটলে রচিত হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজের গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে খাওয়ার অসংখ্য স্মৃতি যেমন রয়েছে তেমনি মুখ খুলে প্রিয়জনকে ভালোবাসা জানান দিতে না পারার আপসোসেও পুড়ছেন অনেকে। বুক ফেটেছে কিন্তু মুখ ফাটেনি অনেক চবিয়ানের।

শাটলে চড়ে বেশি উৎফুল্লতা প্রকাশ করে নবীনেরা। নবীনরা শাটল পেয়ে আনন্দ বন্যায় ভাসে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থী নাজমুল বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সুযোগ পেয়েছিলাম। শাটলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। বন্ধুদের সাথে দলবেধে শাটলে চড়ে ক্যাম্পাসে যাওয়া-আসা বেশ উপভোগ করি।

সাবেক চবিয়ান সালাউদ্দিন বলেন, শাটল ছিলো আমাদের ক্যাম্পাসে প্রাণের অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে শাটল আমাদের অক্সিজেন জোগাতো। আমরা শাটলে চড়ে গান গেয়ে আমাদের মনের ক্লান্তি দূর করতাম। ফিরে যেতে ইচ্ছে করে আবার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। কী গান গাইতেন তখন জানতে চাইলে তিনি শোনালেন- তোমার জন্য নীলচে তারার একটুখানি আলো, ভোরের রঙ রাতে মিশে কালো; কাঠ গোলাপের সাদার মায়া, মিশিয়ে দিয়ে ভাবি, আবছা নীল তোমায় লাগে ভালো!

শাটলে জমা ভালোবাসা 6

বান্ধবীদের সাথে দলবেধে ক্লাস করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী শ্রাবণী রুদ্র। নিজে বন্ধুদলের সাথে গানও গাইতেন। তিনি বলেন, শাটল মানে বন্ধুদলের সাথে গান গাওয়ার এক সুখস্মৃতি। অসংখ্য গান আর আনন্দের উৎসারণ করেছে শাটল। মন চায় আবার ফিরে যাই শাটলে। আবার মেতো ওঠি বন্ধু আড্ডায়। কথার ফাঁকে দুকলি গানও শোনালেন-
‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়, ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়’

গান শেষ করতে না করতেই টপ টপ করে অশ্রুজলে প্রকাশ পেল প্রিয় শাটলের প্রতি শ্রাবণীর জমা ভালবাসা।

এরকম হাজারো গল্প আছে শাটল নিয়ে চবি শিক্ষার্থীদের। এক একটি গল্প দিয়ে লিখা যাবে এক একটি উপন্যাস, রচনা করা যাবে কালের সেরা মহাকাব্য।

স্মৃতিচারণ গল্পে বর্তমান চবিয়ানরা বেশি স্থান পায়নি। তবে অচিরেই তাদের স্মৃতির মানসপটে অংকিত হবে প্রিয় শাটলের প্রতি জমানো ভালোবাসা। যা হবে আগামীর গল্প।

প্রিয় চবিয়ানদের শাটলের প্রতি জমা ভালোবাসা স্মৃতির মানসপটে সদা অটুট থাকুক সেটাই কাম্য।
আর আপনি যদি হন চবিয়ান, শাটলসহ প্রিয় ক্যাম্পাসে আপনার যে কোন স্মৃতি লিখে পাঠান আমাদের ইমেইলে অথবা হোয়াটসঅ্যাপে। নির্বাচিত গল্প নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের আয়োজন করবে চট্টগ্রাম খবর।

ই-মেইলঃ [email protected]
হোয়াটসঅ্যাপ : 01760698098

আকিজ/ফারুক

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm