সন্তানের সাফল্যে শ্রেষ্ঠ জননী হলেন আনোয়ারার রোকেয়া

স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবার ও তিন সন্তানের সব খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো। তাই নিজে কিছু করতে চেষ্টা করতেন রোকেয়া। বাড়িতে হাঁস-মুরগি, শাকসবজির আবাদ করেও বাড়তি কিছু টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করতেন তিনি। এই টাকা দিয়েই সন্তানদের লেখাপড়ার ও সংসারের খরচ মেটাতেন। অভাব থাকলেও সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে ছিলেন খুবই সিরিয়াস। আর তার ফলও মিলেছে হাতেনাতে। নিজে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও তিন সন্তানকেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন রোকেয়া। সেই সন্তানেরা এখন আলো ছড়াচ্ছেন দেশের হয়ে। আর সেই সাফল্যের পেছনে থাকা মা রোকেয়া বেগমকে ‘সফল জননী নারী’ হিসেবে পুরস্কৃত করেছে এবার ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’।

চট্টগ্রামের আনোয়ারার বারখাইন ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসাইনের স্ত্রী রোকেয়া বেগম সফল জননী নারী শ্রেষ্ঠ জয়িতা হিসেবে বেগম রোকেয়া পদক পেয়েছেন। গত শনিবার (৯ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ এবং বেগম রোকেয়া দিবসে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের কাছ থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ কার্যক্রমের আওতায় সফল জননী নারীর শ্রেষ্ঠ জয়িতার সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি।

সফল জননী রোকেয়া বেগম বলেন, যুদ্ধের সময়ে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয় আমাকে। বিয়ের কয়েক বছর পর জীবনে নেমে আসেন ঝড়। অবুঝ সন্তানদের রেখে অল্প বয়সে মারা গেছেন স্বামী। বিগত বছরগুলো ছিলো সংগ্রাম আর দুঃখের, যা ভুলার মত নয়। নিজে পড়াশোনা করতে পারিনি, তাই সব সময় চেয়েছি, আমার সন্তানেরা যেন ঠিকমতো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। কখনো সন্তানদের ভালো কাপড় আর প্রাইভেট পড়াতে পারিনি। তবে পড়াশোনায় ঘাটতি যেন না থাকে, সেটা খেয়াল করতাম। এখন সন্তানেরা দেশের কাজে লেগেছে, সেটাই আমার জন্য আনন্দের। তাদের জন্য আমি কোনো দিন এমন সম্মান পাব, সেটা কখনো ভাবিনি। খুবই ভালো লাগছে।’

জানা গেছে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ুয়া রোকেয়া বেগম পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। পাঁচবছর পরই মারা যান পিতা। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসাইনের সঙ্গে। বিয়ের পাঁচ বছর পর তাদের ঘরে আসেন প্রথম কন্যা সন্তান। বছর না যেতেই মারা যায় সে কন্যা শিশু। এরপরই আবারও তাদের সংসার আলোকিত করে আসেন আরেক কন্যা শিশু। কিন্তু কিছুদিনপরই সে শিশু টাইফয়েড জ¦রে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। রোকেয়ার দুঃখ যেন তাকে পিছু ছাড়াছে না।

বিয়ের ঠিক ১৬ বছরের মধ্যে তাদের সংসারের জন্ম নেন এক ছেলে ও দুই কন্যা। এর কয়েক বছর পরই প্যারালাইজড রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসাইন। ছোট্ট তিন শিশুকে নিয়ে বিধবা রোকেয়া পড়েন বিপাকে। আত্মীয় স্বজনদের সহযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়েন জীবন যুদ্ধে। সংসারের অভাবের মধ্যে তিন সন্তানের মধ্যে দুইজনকে গড়ে তুলেছেন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার হিসেবে। বড় মেয়ে আইরিন আকতার রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যলয়ে রয়েছে রাজস্ব শাখার রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে। ছেলে মোহাম্মদ মঈনুল হোসেন চৌধুরী চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন শাখা) সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর ছোট মেয়ে নাসরিন সোলতানা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল থেকে এসবিবিএস পাশ করে ৩৯তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার ওসমানী মেডিকেল কলেজের রেডিওলজি বিভাগের এমডিএমএসে অধ্যায়নরত।

মায়ের এই সম্মাননা প্রাপ্তিতে নিজেদের অনুভূতি জানিয়ে বড় মেয়ে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যলয়ে রাজস্ব শাখার রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর আইরিন আকতার ও ছেলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন শাখা) সিনিয়র সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ মঈনুল হোসেন চৌধুরী বলেন, মাকে গর্বিত করার চেয়ে আনন্দের পৃর্থিবীতে আর কী হতে পারে! তবে বাবার মৃত্যুর পর মা যেভাবে ম্যাজিকের মতো আমাদের গড়ে তুলেছেন, সেটা ভাবলে এখন অসম্ভব মনে হয়। বাবা বেঁচে থাকলে আজ ভীষণ খুশি হতো। মায়ের কারণে আমরা একেকজন একেক জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছি, সেটা ভাবলেই আনন্দ লাগে।

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।