রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ কার্যকর না হওয়ায় নতুন কৌশল গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি জরুরিভিত্তিতে একটি বিশেষ কমিশন বা বিশেষ দপ্তর গঠনের প্রস্তাব দেন।
মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে আইআইজিএস আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, শুধু চাপ প্রয়োগের কৌশল দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; এর সঙ্গে প্রণোদনাও যুক্ত করতে হবে। এ লক্ষ্যে তিনি মিয়ানমারের জন্য একটি ‘রাখাইন পুনর্গঠন পরিকল্পনা’ গ্রহণের প্রস্তাব করেন।
নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের করণীয় হিসেবে তিনি একটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন, একটি সমন্বিত রোহিঙ্গা কৌশল নির্ধারণ (যার মধ্যে পুনর্গঠন পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে), জরুরিভিত্তিতে বিশেষ কমিশন বা বিশেষ দপ্তর গঠন এবং দেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদারের সুপারিশ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রিত রয়েছে, যা একদিকে বড় মানবিক সংকট, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব নয়; এজন্য বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক জবাবদিহি, লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
‘রাখাইন পুনর্গঠন পরিকল্পনা’র আওতায় সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো ও শিল্পখাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রাথমিক হিসেবে পুনর্গঠনে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে, আর প্রকল্পের পরিধি বড় হলে ব্যয় এক হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, এ পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, বহুপক্ষীয় উদ্যোগ, ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া এবং নিষেধাজ্ঞাসহ পাঁচটি পথ অনুসরণ করা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জটিলতার কথা উল্লেখ করেন।
সেমিনারে ‘ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ (এফএসডিএস)-এর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, রাজনৈতিকভাবে সংকটের সমাধান না হলে বাস্তব সক্ষমতার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পথেই এগোতে হবে। তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আলাদা টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আমিনুল করিম বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি। এ সংকট মোকাবিলায় মানবিক সহায়তার পাশাপাশি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উত্থাপন এবং প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
আইআইজিএসের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা অনেকাংশেই প্রতিবেশী দেশগুলোর পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের উচিত সুপরিকল্পিত নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করা।
আইআইজিএসের ভাইস চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আখতার শহীদ বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর প্রত্যক্ষ ও উল্লেখযোগ্য জাতীয় নিরাপত্তাগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর আর্থিক ব্যয় একশ কোটি ডলারের বেশি। পাশাপাশি কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকার পরিবেশগত ক্ষতিও গুরুতর। তিনি এ সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, বিএনপির কৃষক দলের সহসভাপতি মামুনুর রশিদ খান, জামায়াতে ইসলামীর শুরা সদস্য এ কে এম রফিকুন নবী, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব হুমায়রা নূর, গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য আবু হানিফ এবং ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব শামসুল আলমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক প্রতিনিধিরা।



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।