বাংলাদেশে এসে কথিত স্ক্যামিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি নাগরিকের প্রত্যেকের দুই দিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মুহিদুল ইসলাম এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে মামলার তদন্তকারী সংস্থা কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটকে (সিটিইউ) ২০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর আগে পুলিশ আসামিদের রিমাণ্ডে নেওয়ার আবেদন করেছিল।
রিমাণ্ডে ৬৩ বিদেশির বাংলাদেশে প্রবেশ, তাদের পাসপোর্ট একজন বাংলাদেশির কাছে জমা থাকার কারণ, স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা এবং কথিত অনলাইন প্রতারণার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য বের করার চেষ্টা করবে তদন্ত সংস্থা। একই সঙ্গে কক্সবাজারে আটক একই ধরনের আরেকটি চক্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এরই মধ্যে এই মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন মোহাম্মদ মহসিন নামের এক বাংলাদেশি। ১২ সেপ্টেম্বর নগরের খুলশী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ৬৩ বিদেশি নাগরিকের পাসপোর্ট তার জিম্মায় ছিল। মহসিনের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তিনি নগরের কর্ণফুলী এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম জানান, মহসিনই ৬৩ বিদেশিকে আটতলা ভবনটি ভাড়া করে দিয়েছিলেন। তার পেছনে আর কারা রয়েছে, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে বিদেশিদের বাংলাদেশে প্রবেশের বৈধতা ও তারা কোন ভিসায় এসেছেন, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। মহসিনকে জিজ্ঞাসাবাদে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার আশা করছে পুলিশ।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে নগরের খুলশী থানার জালালাবাদ আবাসিক এলাকার আটতলা ভবনে অভিযান চালিয়ে ৬৩ বিদেশিকে গ্রেপ্তার করে সিটিইউ ও খুলশী থানা-পুলিশ। তাদের মধ্যে লাওসের ৩৫, পাকিস্তানের ২১, চীনের ৫, নেপালের ও ভিয়েতনামের ১ জন করে নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০ জন নারী। পুলিশ বাদী হয়ে খুলশী থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছে। পরদিন শুক্রবার তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় মাস আগে ভবনটির ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন বিদেশিরা। সেখানে সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছিল। এসব ব্যবহার করে ওয়েবসাইট, মোবাইল ফোন, সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কথিত প্রতারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। কখনো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে, আবার বিভিন্ন কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য হ্যাক করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সেটিও তদন্তাধীন।
অভিযানে ভবনটি থেকে ১৭০ ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও বিভিন্ন নথি জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি ট্যাব, একটি সিপিইউ, একটি মনিটর ও ৫টি পেনড্রাইভ। এ ছাড়া পাওয়া গেছে কম্বোডিয়ান এমপ্লয়মেন্ট কার্ড, তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অন্যান্য নথি ও ডিভাইস।
পুলিশ বলছে, বিদেশিদের কথিত অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় দেশীয় একটি চক্র লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে আসছিল। আটক বিদেশিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ চক্রের কয়েকজন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। তাদের শনাক্ত ও অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার শহরের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে ছয় বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে পাঁচজন চীনের ও একজন তাইওয়ানের নাগরিক। তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন ও ৪০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয় এবং আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।


