পানির ঢেউয়ে ভাঙছে মসজিদ-কবরস্থান, উঠে এলো পুরনো কঙ্কাল

ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি’র প্রভাবে আটকে পড়া কয়লাবাহী দুইটি জাহাজের পানির ধাক্কায় ভাঙছে মসজিদ ও কবরস্থান। স্রোতের গতিপথ বদলে পানির ঢেউয়ে ছিঁড়ে গেছে রক্ষাকালীন জিও ব্যাগও। কবরস্থান ভেঙে উঠে এলো কবরস্থানের পুরনো লাশের কঙ্কাল। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানির ধাক্কায় হুমকিতে পড়েছে একটি মসজিদি কবরস্থানও। গত ৪ জুলাই বিকেলে এমনই দৃশ্য চোখে পড়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারার রায়পুর ইউনিয়নের উঠান মাঝি ঘাট এলাকায়।

বর্তমানে গহিরা সমুদ্র উপকূলের এক কিলোমিটারেরও বেশি এলাকার বিভিন্ন স্থানে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এই ভাঙন রোধে অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সাগরের ঢেউয়ের তোড়ে মসজিদ, এতিমখানা ও কবরস্থান সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা স্থানীয়দের।

সরেজমিনে দেখা যায়, জাহাজ দুটি মসজিদ ঘেঁষা কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজের সৃষ্ট ঢেউয়ে মসজিদের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের জিও ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শতবছর পুরোনো কবর থেকে উঠে এসেছে দুটি লাশের কঙ্কাল। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো উপকূলবাসীর। পরে লাশের কঙ্কাল গুলো অন্য একটি কবরস্থানে দাফন করা হয় বলেও জানান স্থানীয়রা।

অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এখনও টেকসইভাবে নির্মাণ না হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা শুধু নয়, বর্ষার সময় নদীতে জোয়ারের পানি বাড়লেও বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। নষ্ট হয় ঘরবাড়ি, ফসল। ভিটেবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয় প্রচুর মানুষ। প্লাবণে ভেসে যায় বসতবাড়ি, জীবন-জীবিকা বিপণ্ন হয়ে পড়ে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এখন রায়পুর উপকূলীয় এলাকা বসবাসের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। টেকসই বাঁধের অভাব এ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। জীবন-জীবিকা বাঁচিয়ে রাখতে উপকূলীয় বিভিন্ন অঞ্চলে বাঁধের জন্য মানুষের আকুতির শেষ নেই।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ২০১৮ সালে সরকার ৩২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের উন্নয়নে ৫৭৭ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু করে। প্রকল্পে রায়পুর ইউনিয়নের ১৩ কিলোমিটারের মধ্যে ৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে পাথরের ব্লক বসানো হয়। বাকি ৫ কিলোমিটার এলাকায় মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ এবং ৫ কিলোমিটারের মধ্যে গহিরা সাগর উপকূলে ২ হাজার ৭০০ মিটার ও সরেঙ্গা শঙ্খ নদীর ২ হাজার ৪০০ মিটারও রয়েছে। এ ৫ কিলোমিটারের জন্য নতুন করে ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

উঠান মাঝি ঘাট গাউছিয়া হিজিরিয়া তাহফিজুল কোরআন হেফজখানা ও এতিমখানা পরিচালক আজগর আলী বলেন, ৯১ ঘূর্ণিঝড়ে সব কিছু বিলীন হয়েও এই মসজিদ আর কবরস্থানটি ছিলো। প্রায় ৩৪ বছরপর জাহাজের কারণে মসজিদ, এতিমখানা ও কবরস্থান সম্পূর্ণ বিলীনের পথে। পানির ঢেউয়ে কবর ভেঙে উঠে গেছে পুরানো দুটি লাশের কঙ্কাল। পরবর্তীতে পাশ্ববর্তী একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মসজিদ কমিটির সিনিয়র সদস্য নুরুল আলম বলেন, জাহাজ আটকানোর এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেউ। দ্রুত জাহাজ সরানের ব্যবস্থা না নিলে সাগরের ঢেউয়ের তোড়ে মসজিদ, এতিমখানা ও কবরস্থান সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি’ পরবর্তী ঝড়ো হাওয়ায় গহিরা উপকূল এলাকা উঠান মাঝির ঘাটে মারমেইড-৩ নামের একটি বার্জ ও নাভিমার-৩ টাগবোট জাহাজ দুটি আটকে পড়ার এক মাস পার হলেও এখনও পর্যন্ত জাহাজ সরানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কতৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে জাহাজ দুটি গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে জব্দ রয়েছে। জাহাজ দুটি বঙ্গোপসাগরে ভাসমান অবস্থায় জোয়ার-ভাটার স্রোতে কখনো কুতুবদিয়া, কখনো মগনামাসহ বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় ভেসে বেড়ায়। সর্বশেষ গত মাসে ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি’র আঘাতে গহিরা উঠান মাঝির ঘাট উপকূলে আটকে পড়ে। আর এতে কপাল পুড়েছে স্থানীয়দের। যার প্রভাবে ভাঙনের তীব্রতা আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজ দুটির পাহারার দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের আনোয়ারার দায়িত্বে থাকা উপ–বিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হক বলেন, জাহাজের কারণে বেড়িবাঁধসহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মসজিদ ও কবরস্থান। দ্রুত জাহাজ গুলো সরানোর জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কতৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, আটকে পড়া জাহাজ দুটির কারণে স্থানীয় মসজিদ, কবরস্থান ও বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। জাহাজ দুটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া জন্য আমরা জাহাজ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, এ বিষয়ে আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের চিঠি পেয়েছি। পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে।

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।