মাদার ট্রি বলতে বনের সেই প্রাচীন, বিশাল ও শক্তিশালী গাছগুলোকে বোঝানো হয়—যারা পুরো বনবাস্তুতন্ত্রকে অদৃশ্য এক ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আগলে রাখে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ‘মা গাছ’ হিসেবে পরিচিত এসব মাদার ট্রি বনের প্রাণভোমরা। একটি বনের সবচেয়ে পুরোনো, বড় এবং বিস্তৃত শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট গাছই মূলত মাদার ট্রি হিসেবে বিবেচিত।
শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জে অন্তত ১০০টির বেশি মাদার ট্রির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। এসব মাদার ট্রির মধ্যে রয়েছে গর্জন, পীতরাজ, ছাতিয়ান, শিমুল, চন্দুল, রং-গামার, অশ্বথ, সুরুজ, বান্দরহোলা, চিকরাশি, বাটনা, গুটগুটিয়া, রক্তন, লোহাকাঠ, পুতিজাম, হুক্কানালি, উরিআম, জগডুমুর, ভাদি প্রজাতির গাছ। তবে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে চাপালিশ। এসব গাছের অনেকগুলোর বয়স ১০০ বছরেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক স্বাধীন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল কাপ্তাই রেঞ্জে মাদার ট্রি প্রায় বিলুপ্তির পথে। কিন্তু রেঞ্জের বিভিন্ন অংশে সার্ভে চালিয়ে অন্তত ১০০টির বেশি প্রাচীন মাদার ট্রির সন্ধান পাওয়া গেছে। সীতাপাহাড়, রাম পাহাড়সহ কাপ্তাই রেঞ্জের দুর্গম অরণ্যে এসব গাছের অবস্থান। গাছগুলোর বয়স ৫০ থেকে শুরু করে শত বছরেরও বেশি। সুঠাম দেহ, সমানভাবে বিস্তৃত ডালপালা ও উন্নত বীজ উৎপাদনক্ষমতার জন্য এসব মাদার ট্রি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মাদার ট্রির সুরক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, এসব গাছের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বনবিভাগ নিয়মিত টহল জোরদার করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেনের সার্বক্ষণিক নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে গাছগুলোর পরিচর্যা করা হচ্ছে। “এই গাছগুলো টিকে থাকলেই বন টিকে থাকবে”—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, শতবর্ষী এসব প্রাচীন গাছ রক্ষায় বনবিভাগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও জরুরি। বন উজাড় ও অবৈধ গাছ কাটার প্রবণতা বন্ধ না হলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদার ট্রি কেবল একটি বড় গাছ নয়—এটি পুরো বনের ইকোসিস্টেমের কেন্দ্রবিন্দু। মাটির নিচে থাকা ছত্রাকজাত নেটওয়ার্ক, যাকে ‘উড ওয়াইড ওয়েব’ বলা হয়, তার মাধ্যমে মাদার ট্রি আশপাশের ছোট ও দুর্বল চারাগাছকে পানি, চিনি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। একই সঙ্গে পোকা বা রোগের আক্রমণের তথ্য রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে অন্য গাছকে জানিয়ে সতর্ক করে দেয়।
এছাড়া মাদার ট্রি বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশের তাপমাত্রা ও মাটির আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। একটি মাদার ট্রি ধ্বংস হলে কেবল একটি গাছ নয়, পুরো বনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে—ফলে চারাগাছের টিকে থাকার সম্ভাবনাও কমে যায়। তাই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও বনের পুনর্জন্ম নিশ্চিত করতে মাদার ট্রি সংরক্ষণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।