পৈশাচিক নির্যাতন-হত্যার পর পুড়িয়ে ফেলা হয় লাশ!

টেকনাফের পাহাড়ে পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানা

0

সবুজে ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্য়ের পাহাড়ি এলাকা কক্সবাজারের সীমান্ত জনপদ টেকনাফ। সময়ের ব্যাবধানে এই অঞ্চল যেন এক অপরাধের কারখানায় পরিণত হচ্ছে। সবুজ পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে আস্তানা গাড়ছে সন্ত্রাসীরা। প্রতিনিয়ত লোকালয় থেকে মানুষজন অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পাহাড়ি আস্তানায়। আর সেখানে নির্মমভাবে নির্য়াতন চালিয়ে দাবি করা হচ্ছে মুক্তিপণ। চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না মিললে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না ভুক্তভোগীদের। প্রথমে নির্যাতন তারপর গুলি করে নেওয়া হয় প্রাণ। আর অপরাধ ডাকতে পুড়িয়ে ফেলা হয় মরদেহ!

জানা গেছে, বিগত ৬ মাসে টেকনাফে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়েছে অন্তত ৬৫ জনকে। টেকনাফের তিনটি ইউনিয়ন হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও বাহারছড়ায় মূলত এসব অপহরণের ঘটনা ঘটছে। এদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা এবং শিশু রয়েছেন। যাদের কেউ কেউ কেউ মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে বাড়ি ফিরেছেন আবার অনেকের লাশ ফিরেছে বাড়ি!

সর্বশেষ গত বুধবার (২৪ মে) দুপুর থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পুলিশ ও র‍্যাব বিভিন্ন যৌথ অভিযান চালিয়ে বাহারছড়ায় পাহাড় থেকে সন্ধ্যার দিকে তিন নিখোঁজের মরদেহ উদ্ধার করে। কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফে পাত্রী দেখতে গিয়ে নিখোঁজ হন তিন বন্ধু

এ ঘটনায় ২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গ্রেপ্ততারকৃত অপহরণকারীরা হলেন, মোচনী ক্যাম্প ব্লক-ই’র আবু সামাদের ছেলে সৈয়দ হোসেন (৩৫) (সোনালী ডাকাত) এবং টেকনাফের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে এমরুল করিম ফইর (৩০)। এছাড়া আরও বেশ কয়েকজন র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায়।

এদিকে তাদের গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বৃহস্পতিবার (২৫ মে) র‌্যাব-১৫ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম জানান, তারা তিন বন্ধু মিলে টেকনাফে পাত্রী দেখতে গেলে গাড়ি থামিয়ে তাদের অপহরণ করা হয়। পরে তাদের পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবার বিষয়টি র‌্যাবকে অবগত করলে অভিযানে নামে র‌্যাব। র‌্যাব তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দুইজনকে আটক করে।
পরে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী টেকনাফ দমদমিয়া এলাকার গহিন পাহাড় থেকে তিন বন্ধুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহগুলো অর্ধগলিত ছিল। মরদেহ নিশ্চিহ্ন করতে ডাকাত দল তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

তিনি আরও বলেন, মরদেহগুলো যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সেখানে মানুষের সমাগম নেই। ডাকাত দলের লোকজন বারবার সিম পরিবর্তন করার কারণে তাদের শনাক্ত করতে একটু দেরি হয়েছে। আটককৃত দুইজন প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেন, তারা এই কাজে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। বিত্তশালীদের টার্গেট করে এসব অপহরণ করতেন তারা। যারা টাকা দিতে ব্যর্থ হয় তাদেরকে মাটির মধ্যে পুঁতে রাখা হতো।

আসামিদের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে অপহরণ চক্রের একটি আস্তানা। অপহরণের পর ভুক্তভোগীদের প্রথমে সেখানে নিয়ে যাওয়া হতো। তারপর অপহৃতদের এই আস্তানায় নির্মমভাবে নির্যাতন করা হত। পরিবারের নিকট হতে মুক্তিপণের দাবিকৃত টাকা না পেলে ভুক্তভোগীদের গুলি করে হত্যা করা হতো। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে ফেলে দিয়ে মরদেহগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হতো।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃত অপহরণকারীরা অপহরণ চক্রের সাথে জড়িত একাধিক ব্যক্তির নাম ঠিকানা প্রকাশ করে। অপহরণ চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে র‌্যাবের আভিযান অব্যাহত আছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে অপহরণ-হত্যা ভয় জাগাচ্ছে স্থানীয়দের মনে। পাহাড়ি জনপদ ধীরে ধীরে যেন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে।

টেকনাফের কলেজশিক্ষক ও হ্নীলার বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ইয়াবা কারবারিদের ধরে নিতে পারলে মোটা অঙ্কের টাকা পাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। স্থানীয় লোকজনের মধ্যে কে ইয়াবা ব্যবসা করেন, তাদের অবস্থান জানা থাকে সন্ত্রাসীদের। মাঝেমধ্যে ভুল তথ্যে সাধারণ ও গরিব কৃষকদের অপহরণ করা হয়। ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হলে সামাজিক অস্থিরতা ও অপহরণের মতো অপরাধও বন্ধ হবে। এই শিক্ষক পাহাড়কে নিরাপদ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সতর্ক এবং কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।