উন্নত জীবনের আশায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে দিন দিন বাড়ছে কানাডা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার স্বপ্ন। বৈধ পথে সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকছে অনিয়মিত ও বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার দিকে, যা নতুন করে মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে।
কক্সবাজারের এক রোহিঙ্গা শিবিরে কথা হয় রোকেয়া (৩৫) নামে এক নারীর সঙ্গে। তিন সন্তান নিয়ে শিবিরে বসবাস করা রোকেয়ার স্বপ্ন—একদিন কানাডা বা আমেরিকায় গিয়ে সন্তানদের পড়ালেখা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। একই শিবিরে থাকা মোহাম্মদ জোহার (৩০) জানান, কাজের সুযোগ না থাকায় রেশননির্ভর জীবন কাটছে তাদের। এই অনিশ্চিত বাস্তবতায় উন্নত দেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তাদের একমাত্র আশার জায়গা হয়ে উঠেছে।
শুধু কয়েকজন নয়—শিবিরের বেশিরভাগ পরিবারের মধ্যেই এখন উন্নত দেশে পুনর্বাসনের স্বপ্ন দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের সহায়তায় গত কয়েক বছরে সীমিতসংখ্যক রোহিঙ্গা তৃতীয় দেশে পুনর্বাসিত হওয়ায় এই আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়েছে।
তবে বৈধ সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা অবৈধ পথে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যেতে চেষ্টা করছে। ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেন, শীত মৌসুমে সমুদ্র শান্ত থাকায় পাচারকারীরা বেশি সক্রিয় হয়। শুধু রোহিঙ্গারাই নয়, প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক বাংলাদেশিও এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় যুক্ত হচ্ছে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে রোহিঙ্গাদের বহনকারী একাধিক নৌকাডুবির ঘটনায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বা নিখোঁজ হয়েছে। এসব সমুদ্রপথ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিবাসন রুটগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা জোরদার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা—এই তিনটি একসঙ্গে কার্যকর না হলে সমুদ্রপথে পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ ছাড়াও থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বিস্তৃত, যা মোকাবিলায় আঞ্চলিক সমন্বয় অপরিহার্য।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) মিজানুর রহমান বলেন, গত পাঁচ বছরে মাত্র কয়েক হাজার রোহিঙ্গা তৃতীয় দেশে পুনর্বাসিত হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নিচ্ছে আরও শিশু। ফলে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের মাধ্যমে পুরো সংকটের সমাধান বাস্তবসম্মত নয়। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আরাকানে নিরাপদ পরিবেশ ও কার্যকর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত না হলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে উন্নত দেশের স্বপ্ন এবং বিপজ্জনক অভিবাসনের ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে এই অনিয়মিত যাত্রা বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
পুরো নিউজ পড়তে ক্লিক করুন



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।