চট্টগ্রাম: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করেও চট্টগ্রাম নগরীতে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। বরং বর্ষা মৌসুমে বাড়ছে এডিস মশার বিস্তার, সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। এর মধ্যে জুলাই মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৩৬ জন এবং আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৬৩ জন। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন তিনজন।
চট্টগ্রামের সদ্য ওএসডি হওয়া সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জুলাই ও আগস্টের প্রথম দিকের আক্রান্তের সংখ্যা বছরের প্রথম ছয় মাসের মোট আক্রান্তের প্রায় দ্বিগুণ। বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। তবে আক্রান্তদের ৯৯ শতাংশের বেশি সুস্থ হয়ে উঠছেন। মারা যাওয়া তিনজনই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেরি করেছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক জরিপেও চট্টগ্রাম নগরীর মশার পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ৮ থেকে ১৮ জুন নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে পরিচালিত জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। পরীক্ষা করা ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতেও লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।
উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা ও দক্ষিণ হালিশহরকে জরিপে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বলেন, জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানির পাত্র এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল হয়ে উঠেছে।
এদিকে মশা নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে শুধু মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনায় প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।
এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে চসিকের ব্যয় প্রায় ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বলে সংস্থাটির তথ্য থেকে জানা গেছে।
তবে এত অর্থ ব্যয়ের পরও নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মশার উপদ্রব কমেনি বলে অভিযোগ করছেন। চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, জামালখান, চকবাজার ও হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত মশার উৎপাত নিয়ে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, নগরীর প্রায় ৭০ লাখ মানুষকে মাত্র সাড়ে তিনশোর মতো কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন। তবুও সিটি করপোরেশন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, পূর্ণবয়স্ক মশা মারার চেয়ে লার্ভা ধ্বংস করা বেশি কার্যকর। তাই ফগার মেশিনে ধোঁয়া ছিটানোর পাশাপাশি মশার লার্ভা ধ্বংসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মশার কোন প্রজাতি কোথায় বিস্তার করছে, তাদের প্রজননস্থল কোথায় এবং কোন কীটনাশক কার্যকর—এসব তথ্য নিয়মিত পরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. আহসান হাবিব সিয়াম বলেন, মশা নিধন কার্যক্রমে কীটতত্ত্ববিদদের পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততা না থাকলে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের পাশাপাশি ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা জরুরি।
নগর পরিকল্পনাবিদ মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তাই কোন ওষুধে মশা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে, তা নিয়মিত পরীক্ষাগারে যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক পরিবর্তন করতে হবে।
চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৬০ সদস্যের বিশেষ দল কাজ করছে। পাশাপাশি আগামী ছয় মাসের জন্য প্রয়োজনীয় লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড মজুত রাখা হয়েছে।


