সদস্য ফরম ১২০০ টাকা, ১০ হাজার টাকা জামানত রাখলে পাওয়া যাবে লাখ টাকা ঋণ আর তিন লাখ ঋণে জমা দিতে হবে মাত্র ২০ হাজার টাকা। প্রতিমাসে ১২শত টাকা জামানতে সে টাকা হবে প্রতিমাসে দ্বিগুণ। এমন লোভনীয় প্রতিশ্রতি দিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কয়েকশত গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন অনিবন্ধিত ও অবৈধ এনজিও ‘ফ্রেন্ডস অব ডিসাবেল সোসাইটি’।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের মালঘর বাজার এলাকার মো. নুরুল কবিরের ভবনে এ ঘটনাটি ঘটলেও শনিবার (৩ অক্টোম্বর) দুপুরে স্থানীয়দের মধ্যে জানাজানি হয়। ঘটনার পর উত্তেজিত ভুক্তভোগী নারী গ্রাহকরা তাদের ভাড়া কার্যালয়ে ভীড় করলে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ভবনে থাকা এনজিও সংস্থার আসবাপত্রগুলো জব্দ করে তালা ঝুলিয়ে দেন।
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে আনোয়ারা-চন্দনাইশ সড়কের পাশে মালঘর বাজার এলাকার এনজিও সংস্থাটির অফিস কক্ষে তালা ঝুলছে। ভুক্তভোগী কয়েকজন নারী আসপাশে ঘুরাঘুরি করে চলে যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানায়, গত বৃহস্পতিবার থেকে অফিসটিতে এনজিও কর্মীদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
ভুক্তভোগী বারখাইন শিলাইগড়ার কামরুল নাহার, ঝিওরীর মো. আবু ছালেহ, বরুমছড়ার শাহাদাত হোসেন, জেসমিন আক্তার, জমিলা আক্তার ঝুমু, ফরিদা বেগম, শারমিন সুলতানা, সুলতানা আক্তার, মরিয়ম বেগম, রায়পুর গহিরার রুমি আক্তার, কামরুনাহার, তাহেরা বেগম, মোহাম্মদ মিজান, সিহাব ও আকিব, রনিসহ একাধিক ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে জানান, গত ১ মাস ধরে ফ্লিড অফিসার মুশফিকুর রহমান, ম্যানেজার মো. আলী নেওয়াজ খানসহ কয়েকজন মাঠকর্মী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম গঞ্জে সাধারণ নারীদের ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে ১২শত টাকা জামানত নেন। এরপরও বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ১ লাখ থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রস্তাব দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ১ হাজারের অধিক গ্রাহকের কোটি টাকা। ঋণের আশায় গ্রাহকরা বৃহস্পতিবার দুপুরে তাদের কার্যালয়ে আসলে তালা ঝুলানো অবস্থায় পাওয়া যায়। বিষয়টি তারা থানা-প্রশাসনকে জানিয়েছে।
সরজমিনে গিয়ে ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত (সোমবার) ২৮ সেপ্টেম্বর মালঘর বাজার এলাকার মো. নুরুল কবিরের ভবনে প্রতিমাসে ১৩ হাজার টাকা ভাড়ায় উঠেন কুষ্টিয়া গোপালপুর এলাকার বাসিন্দা পরিচয়ে মো. জাকির হোসেন, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার আলী আকবরের বাড়ির আবুল কাশেম, ঢাকা মিরপুরের মো. মিনারুল ইসলাম ও ময়মনসিংহ মুক্তাগাছার ইশিতা আক্তারের পরিচয়পত্র দিয়ে ম্যানেজার মো. আলী নেওয়াজ খান ভবনটি ভাড়া নেন। এরপর ভবনে তিনদিন অফিসের কার্যক্রম চালানোর পরে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোম্বর) তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যান তারা।
ভুক্তভোগী রায়পুর গহিরা এলাকার পোশাক শ্রমিক মোছাম্মৎ রুমি আকতার বলেন, মনির নামে এনজিও মাঠকর্মীর মাধ্যমে ১২শত টাকা জামানতে সদস্য হয়েছিলাম। ২ বছর মেয়াদে ঘর বানানোর জন্য তিন লাখ টাকা ঋণের প্রতিশ্রুতি দেন তারা। এরজন্য গত রোববার ২০ হাজার টাকা জমা নেন বৃহস্পতিবার ঋণটি দেওয়ার জন্য। এদিনে তারা অফিসে তালা লাগিয়ে পালিয়ে গেছে। তাদের সবকটি মোবাইল ফোনও বন্ধ।
জানতে চাইলে ভবনের মালিক মো. নুরুল কবির বলেন, গত ২৮ সেপ্টম্বর একটি প্লট ভাড়া নেন এনজিওটির ম্যানেজার মো. আলী নেওয়াজ খান। প্রতিমাসে ১৩ হাজার টাকা ভাড়ায় ১ অক্টোম্বর তাদের সঙ্গে চুক্তিপত্র হওয়ার আগে ৩০ তারিখ রাতে তারা পালিয়ে যায়। পরদিন ভুক্তভোগীরা এসে ভীড় করেন এবং তাদের অভিযোগ গুলো জানান। পরে পুলিশ এসে তাদের সাইনবোর্ড খুলে নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় আমি থানায় অভিযোগ দিয়েছি।
এরআগেও একটি সংস্থা হাইলধর ইউনিয়নের মালঘর বাজার এলাকার এ ভবনে লটারির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এবিষয়ে জানতে ফ্রেন্ডস অব ডিসাবেল সোসাইটির ম্যানেজার মো. আলী নেওয়াজ খানের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. ফয়েজ খান বলেন, ঋণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাইলধর এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্ন নারীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে একাধিক ভুক্তভোগী এসেছিলেন। তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় তাদের ভাড়া কার্যালয় থেকে তারা পালিয়ে গেছেন এবং তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ। ভুক্তভোগীদের এবিষয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েদ চৌধুরী বলেন, এ ঘটনায় ভবনটির মালিক থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, এ বিষয়ে কোনো ভুক্তভোগী কেউ এখনও পর্যন্ত অভিযোগ দেয়নি। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


