চট্টগ্রামের আনোয়ারার উপকূলীয় অঞ্চল রায়পুর ও জুঁইদন্ডী ইউনিয়নে দীর্ঘদিনের ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ প্রকল্পগুলো এখন দৃশ্যমান রূপ পেতে শুরু করেছে।
৩৫০ কোটি টাকা ব্যায়ে ৮ প্যাকেজে ৫ দশমিক ১৭৫ কিলোমিটার নির্মিত ‘দৃশ্যমান বেড়িবাঁধ’ কেবল সমুদ্রের বিশাল তরঙ্গ ও জলোচ্ছ্বাস থেকে লোকালয়কে রক্ষা করবে না, বরং স্থানীয় কৃষি, অর্থনীতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় এনে দিবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মৌসুমে উপকূলীয় এলাকার মানুষকে ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাতে হতো। বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে নোনা জল ঢুকে নষ্ট হতো ফসলি জমি ও চিংড়ি ঘের। তবে বর্তমানে আধুনিকভাবে রিঅ্যাচমেন্ট করা ব্লক, নির্দিষ্ট উচ্চতায় বর্ধিত টেকসই মাটির ঢাল এবং সিসি ব্লকে নির্মিত নতুন দৃশ্যমান বেড়িবাঁধ উপকূলাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবারকে এনে দিবে সুরক্ষিত জীবনের স্বপ্ন।
সম্প্রতি রায়পুরসহ আনোয়ারার উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এনামুল হক। এসময় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, উপসচিব, নির্বাহী প্রকৌশলী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে অতিরিক্ত সচিব নির্মাণকাজের অগ্রগতি ও গুণগতমান পর্যবেক্ষণ করেন। কাজের মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচির মধ্যে সব কাজ শেষ করা এবং নির্মাণের গুণগতমান শতভাগ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন তিনি।
বেড়িবাঁধের দৃশ্যমান কাজে আনন্দিত স্থানীয় বাসিন্দারা। ইতোমধ্যে রায়পুর ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলে এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এতে উপকূলবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার হলেও অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি নির্মাণের মান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগে ঝড়ের সংকেত পেলেই আশ্রয়ন কেন্দ্রে ছুটতে হতো। এখন মজবুত ও দৃশ্যমান বাঁধ দেখে তাঁদের মনে নিরাপত্তা ও স্বস্তি ফিরে এসেছে। বাঁধ সুরক্ষিত হওয়ায় নতুন নতুন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
এছাড়াও বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজে অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি বিভিন্ন প্যাকেজের কাজ নিয়ে উঠা অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে টেকসই বাঁধ নির্মাণ নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান তাঁরা।
রায়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দা জালাল উদ্দিন আনোয়ারী বলেন, ‘আমরা উপকূলবাসী একটি টেকসই বেড়িবাঁধ চাই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ হলে পাল্টে যাবে এলাকার চিত্র। অতীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে কাজের মান নিশ্চিতের আহবান করছি।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ৩৫০ কোটি টাকা ব্যায়ে ৮ প্যাকেজে ৫ দশমিক ১৭৫ কিলোমিটার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও তীর সংরক্ষণের কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে রায়পুর ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলে এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চারটি প্যাকেজে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে জুঁইদন্ডী ইউনিয়নে ২ দশমিক ৪০ কিলোমিটার বাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে অপর চারটি প্যাকেজে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রায়পুর ইউনিয়নে ২ দশমিক ৭৭৫ কিলোমিটার স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা ও বাঁধ সংরক্ষণের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা, বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সূত্র জানায়, আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৪৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে নদীতীরে ৮ কিলোমিটার এবং সমুদ্রতীরে ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার সুরক্ষিত বাঁধ রয়েছে। বর্তমানে নদীতীরে ২ দশমিক ৪০ কিলোমিটার এবং সমুদ্রতীরে ২ দশমিক ৭৭৫ কিলোমিটার স্থায়ী সুরক্ষা বাঁধের কাজ চলমান। নদীতীরে প্রায় ৪ কিলোমিটার এবং সমুদ্রতীরে ২ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের আনোয়ারার দায়িত্বে থাকা উপ–বিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হক বলেন, ‘৮ প্যাকেজে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ১৫০ কোটি ও পাউবো ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ দশমিক ১৭৫ কিলোমিটার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংরক্ষণের কাজ বাস্তবায়নাধীন। এরমধ্যে রায়পুর ইউনিয়নের ২ দশমিক ৭৭৫ কিলোমিটার অংশের এক কিলোমিটার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট ১ দশমিক ৭৭৫ কিলোমিটার অংশের কাজের অগ্রগতি প্রায় ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে জুঁইদন্ডী ইউনিয়নের ২ দশমিক ৪০ কিলোমিটার অংশের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজও শেষ।’
তিনি আরও বলেন, ‘রায়পুরে নির্ধারিত সময়ের আগেই এক কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট কাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ অনুযায়ী ২০২৭ সালের জুনের মধ্যেই সব কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।’


