জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা থামছে না বাংলাদেশিদের। ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে ইতালিতে সাগরপথে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই শীর্ষে রয়েছে। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো গ্রিসে একই পথে প্রবেশকারীদের তালিকাতেও বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে গেছেন আরও ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি।
ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। তবে এই যাত্রাপথে নিয়মিত প্রাণহানি, নির্যাতন, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং লিবিয়ায় আটকের ঘটনা ঘটছে। গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে লিবিয়ার তোবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি নৌকা দিক হারিয়ে ছয় দিন সাগরে ভেসে ছিল। খাদ্য ও পানির অভাবে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ১২ জন ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপমুখী বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের ১০ থেকে ১২টি জেলার মানুষ এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বেশি সম্পৃক্ত।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশে কাজের নামে সংঘবদ্ধ মানবপাচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পাচারকারীরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষকে প্রলুব্ধ করছে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সেই হারে এগোচ্ছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবপাচারের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাইবার স্ক্যামও নতুন সংকট হয়ে উঠেছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেলেও তাদের অনেকেই চাকরি না পেয়ে সাইবার প্রতারণা চক্রের হাতে জিম্মি হয়েছেন। জুন মাসে কম্বোডিয়া থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের ৯৮ শতাংশ জানিয়েছেন, প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশকে জোর করে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হয় এবং ২৭ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এদিকে রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। মানবাধিকার সংস্থা ফরটিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের যৌথ তদন্তে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাকরির আশ্বাসে রাশিয়ায় নেওয়ার পর অনেককে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্যও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
মানবপাচারের শিকার নারীদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। দুবাই, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় গৃহকর্মী বা বিউটি পার্লারে চাকরির প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে অনেক নারীকে জোরপূর্বক যৌন শোষণ ও নির্যাতনের শিকার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্র্যাক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত মানবপাচারসংক্রান্ত ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচার ও তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়নি এবং ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নতুন ৫০০টির বেশি মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি।
এদিকে সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে অভিবাসী চোরাচালানকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সংঘবদ্ধ মানবপাচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণাকারী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিললেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলসহ কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আজ (৩০ জুলাই) আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবপাচার প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংঘবদ্ধ পাচারচক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।


