রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধ ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে রোববার (১১ অক্টোবর) সকাল ৬টা থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় দুটি সংগঠন। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের এ কর্মসূচিতে পর্যটনকেন্দ্রটিতে যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে পর্যটক, পরিবহন শ্রমিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠন দুটির নেতারা জানান, গত ৮ অক্টোবরের বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে প্রশাসনকে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। এর প্রতিবাদে অবরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা বিবৃতিতে বলেন, এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রতিবাদকারীদের দোকানপাট ও বাড়িঘরে তল্লাশি এবং হয়রানি করা হচ্ছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।
৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামের পর নতুন কর্মসূচি
গত ৮ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে সংগঠন দুটি। সমাবেশে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমার সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক বিনয় চাকমা, সাজেক সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক জিকো চাকমা ও সহ-আহ্বায়ক মিলন চাকমাসহ স্থানীয় নেতারা।
সমাবেশে বিনয় চাকমা অভিযোগ করেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে এবং প্রতিবাদী নেতৃত্বকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, মিলন চাকমা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। নতুন জয় চাকমাও এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ দাবি করেন।
পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাবের আশঙ্কা
সাজেক দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকেরা দীঘিনালা-বাঘাইহাট হয়ে সাজেকে যাতায়াত করেন। সড়কে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকলে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, পর্যটকবাহী গাড়ি এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার আয়েও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে আগে থেকে রিসোর্ট ও কটেজ বুকিং দেওয়া পর্যটকদের ভ্রমণসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সাজেক, বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা রুটে চলাচলকারী পরিবহন শ্রমিক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন যাতায়াতেও ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে।
জরুরি সেবা অবরোধের আওতামুক্ত
বিবৃতিতে সংগঠন দুটি জানিয়েছে, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন, সংবাদপত্র বহনকারী গাড়ি এবং সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে।
সংগঠন দুটির নেতারা সাজেক ইউনিয়নসহ বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলার যানবাহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে এলাকা থেকে সরিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও বিবৃতিতে
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়েছে, গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সাজেকের ভুয়োছড়ি, চাইল্যাতলী ও মাচলং ক্যাম্পের আশপাশে জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) নামে পরিচিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষকে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
এ ছাড়া গত ২৯ সেপ্টেম্বর মাচলংয়ের মন্দিরছড়া এলাকায় আঞ্চলিক দুই সংগঠনের মধ্যে গোলাগুলিতে আট বছর বয়সী কস্মিকা ত্রিপুরা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি সাজেক এলাকায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনেছে।
প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষা
সাজেকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং পর্যটন কার্যক্রম সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অবরোধের কারণে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ প্রয়োজন।
অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, সংগঠন দুটিকে অবরোধ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ সত্য নয়। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে তাদের নেওয়া কর্মসূচির প্রতি ইউপিডিএফের সমর্থন রয়েছে।
এদিকে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে গতকাল রাতেও প্রায় তিন হাজার পর্যটক অবস্থান করছিলেন বলে জানিয়েছেন সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা।
বাঘাইছড়ি উপজেলার ইউএনও আমেনা মারজান জানান, সড়ক অবরোধের কথা তিনি শুনেছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় সকাল ১০টার দিকে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকেরা বাঘাইহাটের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।


