মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার মৎস্য খাতে। তীব্র ডিজেল সংকটে উপকূল ও নদীতীরবর্তী এলাকার প্রায় ২০ হাজার জেলে এখন কর্মহীন। জাল-নৌকা প্রস্তুত থাকলেও তেলের অভাবে সাগরে বা নদীতে যেতে পারছেন না মৎস্যজীবীরা।
এরমধ্যে আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হচ্ছে সাগরে মাছ শিকার। অপরদিকে যে কয়েকদিন খোলা আছে তাতেও জ্বালানী সংকটে মাছ শিকারে যেতে পারচ্ছেন না জেলেরা। এতে করে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূল ও কর্ণফুলী উপকূলের প্রায় ২০ হাজার পেশাজীবী জেলে পরিবারের মাঝে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। বেকার হয়ে পড়েছে এ এলাকার জেলেদের কাজে সহয়তা করা কর্মীরাও। জেলেদের চলমান এ সংকট মোকাবেলায় সরকারী সহায়তার দাবী জানিয়েছেন তারা।
রোববার (৫ এপ্রিল) সকালে আনোয়ারা উপজেলার পূর্বগহিরা, ফকিরহাট, ধলঘাট, কর্ণফুলীর সিইউএফএল ফেরিঘাট, মাতব্বর ঘাট, মাষ্টারহাট, ব্রিজঘাট, ইছানগর ঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মৎস্যজীবী নৌকা ঘাটে বেঁধে বসে আছেন। কেউ-কেউ মাছ ধরার নৌকা-ট্রলার মেরামত কাজ করছে।
জেলেরা জানান, পাম্পগুলোতে তেল নেই, আর খোলা বাজারে লিটারপ্রতি ১৭০-২০০ টাকায় তেল বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ জেলের সাধ্যের বাইরে। সাগরে মাছ আহরণ ইতোমধ্যে ৮০-৯০ শতাংশ কমে গেছে। মৎস্য আড়তগুলোতে মাছের সরবরাহ প্রায় বন্ধ। দুই উপজেলায় নিবন্ধিত প্রায় ২০ হাজার জেলের পাশাপাশি এই খাতের ওপর নির্ভরশীল এক লাখ মানুষের জীবিকা এখন হুমকির মুখে। বরফকল, পরিবহন ও আড়ত শ্রমিকরাও কাজ হারিয়েছেন।
আনোয়ারার রায়পুর গহিরার এলাকার মৎস্যজীবি নুরুল আবছার বলেন, পরিবারের মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই মেয়ে এক ছেলে রয়েছে। মাছ ধরে আমাদের সংসার চলে। ঈদের পর থেকে একদিনও মাছ শিকার করতে পারিনি আমরা। এরমধ্যে ১৫ এপ্রিল থেকে ২ মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মাছ ধরা। কর্ণফুলীর মাতব্বর ঘাটে বিমল দাশ নামে এক জেলে বলেন, মাছ ধরা নিষিদ্ধ সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে মৎস্য অফিস যে সহায়তা দেয়, তাতে পরিবার চালানো সম্ভব না। গত এক সপ্তাহ ধরে মাছ ধরার নৌকা ঘাটে বন্ধ রেখেছি।
আনোয়ারা-কর্ণফুলী মৎস্য অফিস জানায়, বঙ্গোপসাগরে আনোয়ারার মাছ ধরার নৌক ও ট্রলার রয়েছে ৯৭৫টি। এসব নৌকা-ট্রলারে নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৭ হাজার ৫০৩ জন, অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৫ হাজার। অপরদিকে কর্ণফুলীতে নৌক ও ট্রলার রয়েছে ১১০টি, ১ হাজার ৪১৪ জন নিবন্ধিত জেলে এবং অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে প্রায় ১ হাজারের উপরে। সবমিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি পরিবার মাছ ধরে সংসার চালান।
এছাড়াও নদী ও জাহাজে মৎস্য ব্যবসায় জড়িত রয়েছে এ উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক ব্যবসায়ী। এসব জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা সাগরে মাছ শিকারের উপরই নির্ভরশীল। সরকার দেশের সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন সমুন্দ্রে সব ধরণের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। এসময় সরকার নিবন্ধিত জেলেদের প্রতিমাসে ৪০ কেজি করে চাউল সহায়তা প্রদান করবেন।
পূর্বগহিরা ফকির হাট তেলের ডিলার মেসার্স মোহাম্মদ নুরের স্বত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ নুর বলেন, উপকূলের মাত্র দুটি দুটি ঘাটে দুই শতাধিক মাছ ধরার নৌকার ৭০ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠান পদ্মা ও মেঘনা ডিজেল দিয়েছে মাত্র ১১ হাজার লিটার। এই তেল আমরা মৎস্যজীবিদের সমানবন্টন করে দিচ্ছি।
কর্ণফুলীর আল্লাহর দান ফিস ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী জুনাত আরমান দুলহান বলেন, ‘সাগরে একটি জাহাজে মাছ সরবাহরে জন্য প্রায় ৮০ হাজার লিটার তেলের প্রয়োজন পড়ে। সেখানে প্রতি জাহাজ তেল পাচ্ছে ৪০ হাজার লিটার মাত্র। তেল সংকটে জাহাজে অর্ধেকে নেমে এসেছে মাছ সরবরাহ। যার কারণে কমেছে মাছ শিকার আর বেড়েছে মাছের দাম দ্বিগুন।’
আনোয়ারা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রাশিদুল হক ও কর্ণফুলী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল আলীম বলেছেন, ‘তেল সংকটের কারণে জেলেরা সাগরে মাছ শিকার করতে পাচ্ছেন না। এসময়ে নিবন্ধিত জেলেদের সহায়তা প্রদান করা হবে এবং মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত অনিবন্ধিত জেলেদের সরকারি সহয়তা প্রদানের আওয়াতায় নিয়ে আসা হবে।’
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘মাছ শিকার সচল রাখার বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন কর্মকর্তাসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


