দালালের খপ্পর— প্রবাস জীবন চট্টগ্রামের নারীদের কাছে ‘জাহান্নাম’

0

চট্টগ্রামের পোশাক শ্রমিকের কোলে বেড়ে উঠছে সৌদি বংশোদ্ভূত সন্তান!
রাঙ্গুনিয়ার গোচরা এলাকার ১৯ বছরের সুন্দরী যুবতী লায়লা (ছদ্মনাম)। তার মায়ের সাথে কয়েক মাসের পরিচয়ে সখ্যতা গড়ে ওঠে মধ্য বয়সি আরেক নারীর। সেই নারী তার মাকে প্রস্তাব দেন- সৌদি আরবে একজন বৃদ্ধা মহিলা আছেন অসুস্থ। তার সেবার জন্য একটা মেয়ে চায়। বেতন-ভাতাও ভালো দিবে।

গ্রামের সহজ-সরল নারী বিশ্বাস করে যাবতীয় নিয়ম-কানুন মেনে নিজের মেয়েকে পাঠিয়ে দেন সৌদি আরব। জীবন-মান পরিবর্তনের আশায় লায়লা সবুজ-শ্যামল, পাহাড়-নদী ঘেরা রাঙ্গুনিয়া ছেড়ে পাড়ি জমান মরুর দেশ সৌদি আরবে। এই মরুর বুকে অনেক স্বপ্ন রচিত হলেও লায়লার জীবনটাই পরিণত হয় তার ভাষায়- জাহান্নামে।

লায়লা বলেন- ‘আমাকে দেওয়া হয় ১৬টি ঘর মোছার কাজ। মেঝে মোছার পর দেয়ালও ধুতে হয়। আমাকে খেতে দেওয়া হতো মুরগির সিদ্ধ মাংস আর এক টুকরো পাউরুটি। তাদের খাবার খেতে আমার সমস্যা হচ্ছে বলায় আমাকে রান্না করে খেতে বলল। আমি রান্না করলে তারা এসে আমার খাবার ‘টেস্টি’ বলে খেয়ে নিতো, আমি উপোষ থাকতাম।’

‘যে মালিকের বাসায় আমাকে কাজ করতে দেওয়া হয়েছিল তার ছিল দুই সংসার। দুই শ্বশুর বাড়ির মানুষজন সেই বাড়িতে থাকতো। আমাকে সবার কাপড়-ছোপড়ও পরিষ্কার করতে হতো। ডিউটি ছিল ভোর ৬টা থেকে-রাত ১টা পর্যন্ত। বাড়ির মালিক রাতে ঘুমানোর আগে ঘড়ির কাঁটা দুই ঘন্টা এগিয়ে রাখতেন। ভোর ৪টাকে ভোর ৬টা বলে আমাকে দিয়ে কাজ শুরু করাতেন।’

‘আমি যখন বললাম দেশে চলে আসবো তখন আমাকে বিদ্যুতের তার দিয়ে মেরে একটা ঘরে আবদ্ধ করে রেখেছিল। দুই দিন কোন খাবার দেয়নি। পরে আমি যখন বললাম- থাকবো, কাজও করবো তখন আমার ঘরের দরজা খুলে দেয়।’

লায়লা বলেন, তাকে কাঠ এবং শক্ত বস্তু দিয়ে নিয়মিত আঘাত করা হতো। শরীর ছাড়াও মাথায় আঘাত করতো। একবার মাথায় আঘাত করলে তিনি জ্ঞানও হারিয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি পালানোর পথ খুঁজছিলেন। কিন্তু বাড়ির প্রধান ফটক কোড দিয়ে লক করা থাকায় তা সম্ভব হচ্ছিল না।

কোন এক রাতে ফটক লক করতে ভুলে গিয়েছিলেন বাড়ির মালিক। ভোরে ওঠে লায়লা পালিয়ে গেলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখলেন একটা গাড়ি তাকে অনুসরণ করছে। তিনি নিশ্চিত হলেন সেটি তার মালিকের গাড়ি নয়। তখন তিনি থামলেন। গাড়িটি ছিল পুলিশের। পুলিশ তাকে আটক করে সেই বাড়িতে আবার পৌঁছে দিলেন।

নির্যাতনে এবার যুক্ত হলো নতুন মাত্রা- ‘চুলের গোছা ধরিয়ারে দেয়ালত মাথা ঠুস মারছে’ (চুলের গোছা ধরে দেয়ালে মাথা ঠুকাতো)।

দ্বিতীয়বার যখন মালিকের বাসায় পুলিশ তাকে ফেরায় সেখানে নির্যাতনের সাথে যুক্ত হয় মালিকের আরেক বন্ধুর যৌন নিপীড়ন। লায়লার জীবনে নেমে আসে আরেক কালো অধ্যায়। লায়লার গর্ভে আসে অনাগত সন্তান। লায়লা টের পান তার সন্তান গর্ভে বেড়ে ওঠছে। গর্ভ যখন প্রকাশ পায় তখন মালিক তাকে তাড়িয়ে দেয়।

লায়লা পৌঁছে যায় সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসে। দূতাবাসের সহযোগিতায় আট মাসের গর্ভবতী লায়লা ফিরেন দেশে। যথা সময়ে লায়লা মা হন। কিন্তু সন্তানের পিতা হয়নি কেউ।

লায়লার মা বলেন- ‘পাড়া-প্রতিবেশীকে বলেছি, সৌদিতে মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সংসার না টিকায় মেয়ে দেশে চলে আসছে। সে এখন পোশাক শ্রমিক। মেয়ে (লায়লা) যখন কারখানায় যায় নাতিনকে আমি দেখি। তার চোখ, নাক, চুল সব আরবদের মতো হয়েছে।’

ভাগ্য বদলাতে চেয়েছিলেন লায়লা। কিন্তু ভাগ্য বদলেছে ঠিকই, সমাজে আর তিনি মুখ দেখাতে পারছেন না। পোশাক কারখানা-ঘর-পোশাক কারখানায় সীমাবদ্ধ তার দুনিয়া। নাড়ি ছেঁড়া ধন সন্তানকে পরম আদরে রেখেছেন। এই সন্তানের ভবিষ্যত কিংবা নিজের ভবিষ্যত কোনটা নিয়েই তিনি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না।

পরিবারটি এখন সমাজচ্যূত। আত্মীয়-স্বজনও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরা তাদের পাশে আছেন। সাহস যোগাচ্ছেন, স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে মানসিক শক্তি যোগানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।

ভবিষ্যত নিয়ে কী চিন্তা করছেন জানতে চাইলে চোখ মুছে লায়লা বলেন- ‘খোদার আতত ছাড়ি দিই’ (খোদার হাতে ছেড়ে দিয়েছি)।

লেবাননে বাংলাদেশী নারী শ্রমিকের ছবি দিয়ে খোঁজা হয়েছে খদ্দের!
উত্তর চট্টগ্রামের ভূজপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম রাঙামাটিয়ার গৃহবধু ‘সুলতানা’(ছদ্মনাম)। স্বামীর লিভার সিরোসিস শনাক্ত হলে অন্ধকার নেমে আসে তার দু’চোখে। মুক্তির দূত হিসেবে হাজির হয় পাশের কোন এক গ্রামের এক পাতানো বোন। সেই বোনের আন্তরিকতায় মুগ্ধ সুলতানা! এ যেন হাজার বছরের পরিচয়-সম্পর্ক!

মুখের মধুর ভাষার আড়ালে কী লুকায়িত তা বোঝার সুযোগ হয়নি কারো। সেই বোনের প্রস্তাব ছিল- স্বামীকে বাঁচানোর পাশাপাশি সন্তানদেরও জীবন নিশ্চিত হবে যদি সুলতানা লেবানন যায়। লেবাননে গিয়ে অনেক টাকা কামাতে পারবে। ঘরের কাজ শুনে তিনিও রাজি হলেন।

কিন্তু লেবানন গিয়ে তিনি হয়ে গেলেন ‘ভোগের পণ্য’, তার ছবি তুলে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হচ্ছিলো। খোঁজা হচ্ছিলো খদ্দের। এভাবে খদ্দের আসে, যায়। শুরু হয় তার জীবনের অন্ধকার আরেক অধ্যায়।

এক পর্যায়ে তিনি সেখান থেকে কৌশলে পালাতে সক্ষম হন। আশ্রয় মেলে আরেক লেবাননির বাসায়। সেই বাসায় সাত মাস কাজ করেছেন আত্মগোপনে থেকে। এই সাত মাসে তার হাতে কিছু টাকা জমে।

এদিকে যার জন্য সুলতানা আত্মীয়-স্বজন সব ছেড়ে মরুর দেশে পাড়ি জমালেন সেই স্বামী দুনিয়ার থেকে পাড়ি জমালেন পরপারে। সুলতানা ফিরে এলেন, স্বামী হারালেও যক্ষের ধন দুই ছেলেকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিবেন।

দেশে এসে দেখেন তার আর কিছুই নেই। নেই বলতে তার সব স্বজন পরতো হলোই নাড়ী ছেঁড়া ধন ১৪ আর ১০ বছরের দুটি ছেলেও মা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। স্বামী মারা যাওয়ায় স্বামীর বাড়িতে তার আর স্থান হয়নি।

যা কিছু টাকা এনেছেন তা দিয়ে সুলতানা জনবিচ্ছিন্ন দূর্গম টিলার আড়ালে কুঁড়ে ঘর বেঁধেছেন। খাওয়া-দাওয়া কোন কিছুরই ঠিক ছিল না। মানুষ দেখলেই তিনি ভীত হয়ে পড়েন। প্রবাস জীবনের সেই ভীতি তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন।

তার এমন অবস্থা জেনে একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরা তাকে মানসিক শক্তি যোগান। একটানা কাউন্সেলিং করে সুলতানাকে মূল ধারায় ফেরানোর চেষ্টা করেন।

সুলতানা জানান, স্বামী মারা যাওয়ার খবর শুনে তিনি লেবানন থেকে দেশে আসার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু যেহেতু তিনি লেবাননির বাসায় অবৈধভাবে আত্মগোপনে থেকে কাজ করছিলেন তার দেশে ফেরাটা স্বাভাবিক ছিল না। ওই লেবাবনি তাকে পরামর্শ দেন পুলিশে ধরা দেওয়ার জন্য। সেই পরামর্শে তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পন করেন। লেবাননে তিনি একমাস কারাভোগের পর তাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

উন্নয়ন কর্মীদের সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রীর গৃহহীনদের ঘর দেওয়ার প্রকল্পের একটি ঘর পেয়েছেন সুলতানা। বর্তমানে ফটিকছড়িতে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘরে বসবাস করছে তিনি।

প্রবাসী নারীর জীবন বিপন্ন করে আরেক প্রবাসী পুরুষ!
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মেয়ে কুলসুমার (ছদ্মনাম) স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তিনি পাড়ি জমান দুবাই। সেখানে গিয়ে তার মালিকের পার্লারে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ নেন। কাজের ফাঁকে তিনি তার মালিককে সহযোগিতা করেন। মালিকও তার সেই সহযোগিতায় খুশি হয়ে প্রথমে টুকটাক কাজ করান। এভাবে মালিকের সহযোগিতায় তিনি পার্লারের কিছু কাজ রপ্ত করেন।

কুলসুমার দক্ষতায় মালিক মুগ্ধ হয়ে তাকে পার্লারে কাজের সুযোগ দেন। আত্মবিশ্বাসী কুলসুমা প্রথমবার ভিসার মেয়াদ শেষ হলে দেশে ফিরে আসেন। দ্বিতীয়বার বিদেশ যান সেই মালিকের একজন দক্ষ বিউটিশিয়ান হিসেবে। এই মেয়াদে কুলসুমা বেশ আয়-রোজগারও করেন।

নিঃসঙ্গ কুলসুমার সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে পরিচয় হয় আরেক প্রবাসীর। তার বাড়ি কুমিল্লা। কুমিল্লার সেই প্রবাসীর সাথে তার সম্পর্ক গড়ায় বিয়েতে।

একটু সুখ, স্বস্তির স্বপ্নে বিভোর কুলসুমা শুরু করেন দ্বিতীয় স্বামীর সংসার। সেই স্বামীই তার জীবনটা বিষিয়ে তুলেন।

বিদেশ থেকে দেশে ফিরে কুলসুমা উত্তর চট্টগ্রামের অন্যতম জংশন ঝংকারে গড়ে তুলেন একটি অত্যাধুনিক বিউটি পার্লার। সেই পার্লারের তার আয়-রোজগার ছিল বেশ ভালো।

তার আগের সংসারের আছে একটি কন্যা সন্তান। নিজের সুখের পাশাপাশি সেই সন্তানের ভবিষ্যত গড়তে যুদ্ধে নামেন কুলসুমা। তার ভাবনায় ছিল স্বামীও তার পাশে থাকবেন। কিন্তু এই স্বামী যে মাদকাসক্ত সেটি প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার সময় কুলসুমা টেরই পাননি।

দ্বিতীয় স্বামীর আসল চেহারা প্রকাশ হয় বিয়ের পর। ততদিনে সময় অনেক গড়িয়েছে। মাদকাসক্ত স্বামীর অশোভন আচরণের শিকার হয় আগের সংসারের মেয়েটিও। কুলসুমার কিছু টাকা পয়সা জমেছে। স্বামী শারীরিক নির্যাতন করে নিয়মিত তার থেকে টাকা পয়সা নিয়ে নেয়।

কুলসুমার দ্বিতীয় স্বামী মুলত তার সম্পদের লোভেই তাকে বিয়ে করেছে। সংগ্রামী এই নারীর পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ালো স্বামী। তার শুরু হয় আরেকটি সংগ্রাম। এই সংগ্রামে তিনি পাশে পান স্থানীয় প্রশাসনকে। প্রশাসনের মধ্যস্থতায় কুলসুমার আবারও ডিভোর্স হয়।

আগের সংসারের মেয়ে, দ্বিতীয় সংসারের ছেলে নিয়ে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন জীবনের চাকা। প্রথম স্বামী তার পথে থাকলেও দ্বিতীয় স্বামী ছেলেকে কেড়ে নিতে উদ্যোগ নেয়। কিন্তু প্রশাসন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর ভূমিকায় কুলসুম তার নাড়ি ছেঁড়া দুটি সন্তান নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন জীবন সংসার।

প্রবাসে মনসুরা সফল হলেও খালি হাতে ফিরেছেন কোহিনূর!
চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানার ঘাটফরহাদবেগের স্থায়ী বাসিন্দা, চার সন্তানের জননী মনসুরা বেগম। তিনি গিয়েছিলেন ওমান। সেখানে তিনি গৃহকর্মী হিসেবে যে বাসায় গিয়েছেন তারা তার সাথে মানবিক আচরণ করেছেন বলে জানান মনসুরা বেগম।

গৃহের কাজ করে যে টাকা আয় করেছেন তাতে তিনি দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এক ছেলে পড়াশোনা করছে, আরেক ছেলে রিক্সা গ্যারেজ দিয়ে স্বাবলম্বি হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে তার নিজের দুটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সা রয়েছে।

তবে এখানেও আছে তার পরিবারের সমর্থন। মনসুরা বেগম বিদেশ যাওয়ার আগে নিজের মায়ের নামে ব্যাংক একাউন্ট করে গেছেন। মা সেই টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করেছেন।

মনসুরা বলেন- ‘বিদেশ গরি দুগা মাইয়্যা বিয়া দিইয়্যি, পোয়ারেও মানুষ গইজ্যি’ (প্রবাসের আয়ে দুইটি মেয়ে বিয়ে দিয়েছি, ছেলেদেরও মানুষ করেছি।

সফলতার রহস্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আরবি বুঝতাম। আমার জন্য আমার সেই কফিলের দরজা এখনো খোলা। আমি যেতে চাইলে এখনো তারা ভিসা দিবেন। কিন্তু ছেলে-মেয়ে সব মানুষ করেছি। আত্মীয় স্বজন ছেড়ে আর যাবো না।

বিপরীত চিত্র কোহিনূরের জীবনে
সৌদি আরবের দাম্মামে গেছেন হালিশহরের কোহিনূর (ছদ্মনাম)। মাসে ১৮ হাজার টাকা বেতনে তিনি বিদেশ যান। মালিকের বাসায় নিয়মিত তার ওপর নির্যাতন চলতো।

দেশে ফেরার আগে তার গায়ে গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। হাসপাতালে তার সাথে পরিচয় হয় এক বাঙ্গালী যুবকের। সেই যুবক ওই হাসপাতালের সুইপার।

চিকিৎসা শেষে নির্দিষ্ট দিনে কোহিনূরের মালিক হাসপাতালে আসলে সেই সুইপার কর্তব্যরত নার্সকে দিয়ে মালিককে বুঝায়- কোহিনূর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেতে আরও দুই দিন সময় লাগবে।

এই দুই দিনের প্রথম দিন বাঙ্গালী সুইপার কোহিনূরকে পালিয়ে দূতাবাসে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। দূতাবাসের সহযোগিতায় প্রবাস জীবনের এক বছরের মাথায় কোহিনূর দেশে ফিরে আসেন।

তবে এই এক বছরে তিনি নির্যাতন সহ্য করলেও তার বেতন ঠিকঠাক দিয়েছিল মালিক। যে দালালের মাধ্যমে তিনি বিদেশ গিয়েছেন সেই দালাল তার আয় মেরে দিয়েছে।

কোহিনূর জানান- তাকে ওই দালাল সৌদি মালিককে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়েছিল। মাসে একবার তার পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলার সুযোগ দিতো। ফোন নাম্বার ছিল সেই দালালের! তিনি আরবি ভাষা না বুঝায় বিষয়টি তাদেরও বুঝাতে পারেননি। তার বেতন সেই দালাল ভোগ করেছে।

তবে এখানেই শেষ হয়নি কোহিনূরের কষ্ট। দেশে এসে জানতে পারেন তার স্বামী আরেক বিয়ে করে দিব্যি সংসার করছেন। কোহিনূরের চোখে মুখে রাজ্যের হতাশা। তার পাশে আছেন একাধিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরা।

তাকে এখনো নিয়মিত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগে চিকিৎসা নিতে হয়।

চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী কিংবা হালিশহর, উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি-ভূজপুর কিংবা রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদীর পাড়, সব খানেই সক্রিয় নারী দালাল। তাদের টার্গেট সুন্দরী, অভাবী সংসারের নারী। যারা ভাগ্য বদলাতে যে কোন ঝুঁকি নিতে পারেন। কোহিনূর কিংবা লায়লা, মনসুরা কিংবা সুলতানা সবাই বৈধ উপায়ে, পরিশ্রম করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছেন। এক মনসুরা ছাড়া সবাই ঠকেছেন।

তবে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাবকারীকে কেউ আর দ্বিতীয়বার খুঁজে পাননি। এতে একটা বিষয় স্পষ্ট যে সবাই দালালের খপ্পরে পড়েছিলেন। আর বিদেশগামী এসব নারীরা পড়াশোনা না থাকায় কোন এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছেন, কী কাজে যাচ্ছেন তা কারো কাছে নিশ্চিত ছিল না। সেই পরিচিত মুখ যা বলেছেন তাই তারা শুনে ঠকেছেন।

জানতে চাইলে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের উপপরিচালক জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, বিদেশ গমনের সরকারি নিয়ম মেনে না গেলে যে কেউ বিপদে পড়তে পারেন। যাদের করুন কাহিনী বলেছেন তারা সবাই দালালের খপ্পরে পড়েছেন। তাই আমরা দালাল না ধরে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদেশ যেতে প্রচারণা চালাচ্ছি। সবাইকে আহ্বান করবো- বৈধ পথে বিদেশ যান। নিজের জীবন ও আয় নিরাপদ করুন।

প্রবাস ফেরত নারীদের করুন চিত্র জেনে দালালদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টি বিশেষ অগ্রাধিকার দিবেন বলে জানান র‌্যাব-০৭এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এমএ ইউসুফ ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক।

বি:দ্র: প্রবাসী নারীদের নিয়ে দৈনিক চট্টগ্রাম খবরে প্রকাশিত চারটি প্রতিবেদনের পরিমার্জিত রূপ- দালালের খপ্পর— প্রবাস জীবন চট্টগ্রামের নারীদের কাছে ‘জাহান্নাম’। বার্তা বিভাগ- দৈনিক চট্টগ্রাম খবর।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm