পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় সার সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। বাজারে চড়া দামে সার বিক্রি হওয়ায় বেগ পেতে হচ্ছে কৃষকদের। শঙ্কা তৈরি হয়েছে রবি ও খরিপ মৌসুমের ফসল উৎপাদন নিয়েও। সার বিক্রি নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে ডিলারদের বিরুদ্ধে। তবে বিসিআইসি সার ডিলারদের অভিযোগ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে সার বরাদ্দে ঘাটতি রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরাদ্দের সার পাচার হচ্ছে বাঘাইছড়ি উপজেলায়। অন্যদিকে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ উপায়ে সার প্রবেশ হচ্ছে দীঘিনালায়। অবৈধ উপায় কাজে লাগিয়ে বাড়তি মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করছেন সারের ডিলাররা। কৃষকের কাছে সার বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। প্রতি বস্তায় টিএসপি সারে ৯০০ টাকা, এমওপি সারে ৫০০ টাকা ও ডিএপি সারে ৪০০ টাকা এবং ইউরিয়া সার ১৫০ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। আর দাম লুকাতে ডিলাররা বিক্রি ভাউচারের পরিবর্তে সাদা কাগজ ধরিয়ে দেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, খুচরা সার বিক্রেতা কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি টিএসপি বিক্রি করছে ৪২ থেকে ৪৫ টাকা, এমওপি ২৮ থেকে ৩০ টাকা, ডিএপি ২৮ থেকে ৩০ টাকা। ইউরিয়া ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। যেখান, সরকার ভর্তুকি প্রদান করে কৃষির সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে সরকারি নির্ধারিত কৃষক পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য টিএসপি ২৭ টাকা, এমওপি ২০ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা, ইউরিয়া ২৭ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারের নির্ধারিত কৃষক পর্যায়ে বিক্রিমূল্য ডিএপি সার ১০৫০ টাকা। সে সার বিক্রি হচ্ছে প্রতি বস্তুা ১৩৮০ টাকা ১৪৫০ টাকা। এ ছাড়া ডিএপি সার বিক্রি নিয়ে রয়েছে প্রতরণার অভিযোগ। বিভিন্ন নামে বিক্রি হয় এই ডিএপি সার। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) রাঙ্গাদিয়া থেকে আসে তাই ডিলার নাম দিয়েছে রাঙ্গাদিয়া ডিএপি। এই রাঙ্গাদিয়া(ডিএপি) বিক্রি হয় প্রতি বস্তা ১৮০০-২০০০ টাকা, কখনো অস্ট্রেলিয়া ১৪০০ হতে ১৪৫০ টাকা, কখনো মরক্কো (ডিএপি) ১৪০০ হতে ১৫০০ টাকা।
আরও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাজারের যে সারের চাহিদা বেশি সে সার বস্তা মোড়ক উন্মোচন করে বিক্রি করা হয় চড়া দামে। তবে এ সব সার-ই ডিএপি সার। সরকার নির্ধারণ করা সার আইন না মেনে মনগড়া নামে, নিজেদের দেওয়া দামে বাজার দর তৈরি করে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরিয়া সার বিক্রি নিয়ে রয়েছে অভিনব প্রতারণা। মোটা ইউরিয়া বিক্রি হয় ১৪৫০ টাকা ও চিকন ইউরিয়া বিক্রি হয় ১৫৫০ টাকা। মোটা ও চিকন ইউরিয়া নাম দিয়ে কৃষকের সাথে প্রতারণা করে বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছেন সার ডিলার মালিক পক্ষ।
তবে ইউরিয়া সার চিকন ও মোটা বলে আলাদা কোন দর নির্ধারণ নেই বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুপন চাকমা। তিনি বলেন, এগুলো যদি হয় তাহলে সার ডিলারের কারসাজি। সরকারি বরাদ্দে চিকন ও মোটা নামে কোন সার বরাদ্দ আসে না। ইউরিয়া সার নামেই বরাদ্দ আসে।
উপজেলার খুচরা সার বিক্রেতা ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সুসময় চাকমা জানান, বোয়ালখালী বাজারের বিসিআইসি সার ডিলার এস এস টের্ডাস ভাই ভাই টের্ডাস হতে সার ক্রয় করে এনে কৃষক পর্যায়ে সার বিক্রি করি। বিসিআইসি সার ডিলার প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার ১৩৮০ টাকা ও টিএসপি ২০০০ টাকা, ডিএপি ১২০০ টাকা, এমওপি ১১৮০ টাকা করে ক্রয় করে থাকি।
এক খুচরা সার বিক্রেতা সুমেন চাকমা জানান, আমরা বিসিআইসি সার ডিলারের কাছে জিম্মি হয়ে আছি। যে দামে সার কিনে আনি সে দামেই বিক্রি করতে হয়। তাছাড়া প্রতি বস্তায় ৩ থেকে ৫ কেজি সার কম থাকে। সারের দাম, গাড়ি ভাড়া, লেবার খরচ দিয়ে প্রতি বস্তায় আমাদের দেড়শ-দুইশ টাকা লোকসান থাকে।
একই কথা বলেন খুচরা সার বিক্রেতা রহমত উল্লাহার ছেলে মো. আকরাম, খুচরা ডিলার বিক্রেতা, অনিল চাকমা, টিটো চাকমা, গোলজার হোসেন, নিমেন চাকমা, অর্বণা চাকমা, নাইম হোসেন, মো. লতিফ মিয়া, পূর্ণ সেকর চাকমা, অসীম চাকমা। ইউসুফ মিয়া, এদের সবার অভিযোগ কৃষি অফিসের নিয়মিত তদারকি ঘাটতি থাকায় এভাবে শোষন করছে খুচরা সার বিক্রেতা ও কৃষকদের। সবাই রীতিমতো জিম্মি তাদের কাছে।
তারা বলেন, নির্ধারিত রেটে আমরা খুচরা সার বিক্রয় করতে পারচ্ছি না। যে রেটে সার ক্রয় করে থাকি প্রতি কেজি ২ টাকা বেশি নিয়ে সার বিক্রি করে থাকি। এ সময় তারা আরও দাবি করে বলেন, প্রশাসনে তদারকি বাড়ানো দরকার।
সূত্রে জানা যায়, দীঘিনালা উপজেলার বরাদ্দের সার অবৈধভাবে রাঙ্গামাটি বাঘাইছড়ি উপজেলার, বাঘাইহাট, ওজোবাজার, মাচালং, সাজেক, উদয়পুরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে এসব বরাদ্দের সার পাচার হয়। এতে করে সার ঘাটতি পরে উপজেলায়। আবার অবৈধ উপায়ে সার দীঘিনালা প্রবেশ করিয়ে বাড়তি টাকা নিচ্ছেন ডিলার মালিক পক্ষ।
এ বিষয়ে কথা হয় উপজেলার বাঙালি, চাকমা, ত্রিপুরা কমিউনিটির অন্তত অর্ধ শতাধিক কৃষকের সাথে। তাদের অভিযোগ বিসিআইসি সার ও খুচরা সার বিক্রেতা সরকার নির্ধারিত রেটের চাইতে বেশি দিয়ে বিক্রি করা হয়। দেওয়া হয় না বিক্রি ভাউচার।
সার ডিলার এসএস টের্ডাসের মালিক লোকমান জানান, ঠিকমতো বরাদ্দের সার পাওয়া যায় না। তাই বাহির হতে সার কিনে আনতে হয়। কৃষকের চাহিদা পূরণ করতেই চড়া দামে সার এনে আবার কৃষকের কাছে বিক্রি করতে হয়। সার ডিলার মের্সাস ভাই ভাই স্টীল অশোক দত্ত বলেন, পরিমাণ মতো বরাদ্দ পাওয়া যায় না তাই বাহির থেকে সার কিনে আনতে হয়। এজন্য সার দাম একটু বেশি।
সার বিক্রি কারসাজি ও প্রতারণা নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সার বরাদ্দ কম দেওয়া হয়েছে কথাটি সত্য নয়। পরিমাণ মতো বরাদ্দ দেওয়া হয় ডিলারদের।
তিনি আরও বলেন, সারের ডিলাররা অনলাইনে আবেদন করে সার নিয়ে আসে। তবে বেশির ভাগ সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে অবগত করে না। বাহির থেকে সার আনলেও বেশি দাম সার বিক্রি করার কোন নিয়ম নেই। আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।