সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের বর্ষাকাল ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের জন্য পরিচিত। এ সময়ে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তাই এ সময় সকলকে সতর্ক থাকতে হয়।
ডেঙ্গুর সাধারণ কিছু উপসর্গ ছাড়াও, শরীর থেকে রক্তক্ষরণ, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট, এমনকি চোখেও সংক্রমণ দেখা দেয়। কমতে থাকে প্লেটলেট বা অনুচক্রিকার সংখ্যা। ডেঙ্গু নিয়ে সাবধান হওয়ার দরকার আছে অবশ্যই, তবে সচেতনতাও জরুরি। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, লক্ষণ দেখেই একগাদা ওষুধ খেয়ে নেয়া বা নানা রকম টোটকা ব্যবহার করতে শুরু করে দেওয়া ঠিক নয়। রোগের সঠিক চিহ্নিতকরণ আগে দরকার।
ডেঙ্গুর জ্বর থাকে ৩-৭ দিন। ঐ সময়ে প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা থাকে, গায়ে হাত-পায়ে ব্যথা হয়, তীব্র মাথা যন্ত্রণা এবং হালকা শ্বাসকষ্টও হতে পারে। এই বিষয়ে চিকিৎসকরা বলেন, রোগের বেশি বেড়ে গেলে তখন শরীরে পানির ঘাটতি হতে থাকে, রক্তচাপ আচমকা কমে যায়, হৃৎস্পন্দনের হার বেড়ে যেতে পারে।
এই সব লক্ষণ দেখেই ওষুধ কিনে খেয়ে ফেলা বা অনলাইন ঘেঁটে বিভিন্ন ঘরোয়া টোটকা ব্যবহার করতে শুরু করলেই মুশকিল। আগে রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে। তাতে ডেঙ্গু ধরা পড়লে তবে চিকিৎসা শুরু হবে। একমাত্র চিকিৎসকই বলতে পারবেন রোগীকে ঘরে রেখে চিকিৎসা করা যাবে না কি হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
বাসতবাড়ির আশেপাশের এলাকায় মশানাশক স্প্রে করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসকরা আরো বলেন, এনএস১ অ্যান্টিজেন’ টেস্ট আগে করা জরুরি। এই টেস্টের রিপোর্ট দেখে বোঝা যাবে শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে কি না। অনেকেই এনএস১ টেস্ট করে ভাবেন ডেঙ্গু হয়েছে। সেখানেও ভুল হয়। ঐ পরীক্ষায় কেবল ভাইরাসের উপস্থিতি অনুমান করা হয়। সেই ভাইরাস ডেঙ্গু কি না, তা ধরতে রক্তের অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করতে হয়। তার জন্য ‘আইজিএম’ ও ‘আইজিজি’ অ্যান্টিবডি টেস্ট করা জরুরি, যা নিশ্চিত ভাবে ডেঙ্গু সংক্রমণ চিহ্নিত করতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর ৩ থেকে ৭ দিন থাকে, এরপর জ্বর কমতে থাকে। জ্বর কমতে শুরু করার পর পরই আসল বিপদটা শুরু হয়, ডেঙ্গির চরিত্র অনেক বদলেছে। জ্বর যে দিন থেকে কমতে থাকে, ডেঙ্গির খারাপ সময়টা সে দিন থেকেই শুরু হয়। এরপর থেকেই রোগীর শরীরে সাইটোকাইন স্টর্ম বা হাইপার ইমিউন রিঅ্যাকশন শুরু হয়ে যায়।
‘সাইটোকাইন স্টর্ম’ হচ্ছে যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধী কোষগুলোই শরীরের শত্রু হয়ে ওঠে। অতি সক্রিয় হয়ে অন্যান্য সুস্থ কোষগুলোকে নষ্ট করতে থাকে। তখন মারাত্মক প্রদাহ হয়। প্লেটলেটের সংখ্যা কমতে থাকে। বিভিন্ন রক্তবাহী জালিকাগুলো ছিঁড়ে গিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। একে বলে ডেঙ্গু হেমারেজিক জ্বর। শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, রোগীর শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এটি হলো ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ, যা এখন অনেকেরই হচ্ছে। কেবল জ্বর, মাথাব্যথা বা গায়ে র্যাশ বেরোলেই যে ডেঙ্গু হবে, তা নয়। যদি শরীরের বিভিন্ন ধমনী ও শিরা ফেটে গিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে, নাক-মুখ, দাঁত, মাড়ি, মলদ্বার, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত বেরিয়ে আসে, তখন সাবধান হতে হবে।
বাড়ির আশেপাশে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করুন
ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে যা করবেন
• ডেঙ্গুর এডিস মশা ভোরে ও সন্ধ্যায় বেশি কামড়ায়। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা, ভোর ৪টা থেকে সকাল ৬টা ডেঙ্গুর মশা বেশি সক্রিয় থাকে। এলাকায় যদি মশার উৎপাত বেশি থাকে, তাহলে ঐ সময়ে প্রয়োজনে ঘরের জানালা বন্ধ রাখুন। মশারি ব্যবহার করতে হবে অবশ্যই।
• বাড়ির কোথাও পানি যেন না জমে থাকে, খেয়াল রাখতে হবে। বাড়ির ছাদে, টবের মধ্যে, রান্নাঘরে কোথাও পানি জমতে দেবেন না। খোলা পাত্রে পানি রেখে দেবেন না।
• বাড়ির আশেপাশে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করুন। নোংরা বা আবর্জনা যেন না জমে থাকে। যদি নিকাশি ব্যবস্থা বেহাল হয়, তাহলে স্থানীয় পৌরসভায় যোগাযোগ করুন।
• ঘরের জানলা, ভেন্টিলেটর অথবা বাড়ির যেসব অংশ দিয়ে মশা ঢোকার আশঙ্কা প্রবল, সেই জায়গাগুলোতে জাল ব্যবহার করতে পারেন।
• ব্লিচিং পাউডার জীবাণুনাশক হলেও ডেঙ্গুর লার্ভা মারতে পারে না। সে ক্ষেত্রে ‘অ্যান্টি-লার্ভাল স্প্রে’ ব্যবহার করতে হবে।
ডেঙ্গু জ্বর পরবর্তীতেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
ডেঙ্গু জ্বর ধরা পড়ার পরে সতর্কতা
• জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ঠিকমতো ডোজে দিলে জ্বর কমে। আর কোনো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া ঠিক নয়।
• লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নীচে থাকে।
• রোগীকে ব্যথা কমানোর জন্য অ্যাসপিরিন বা ঐ জাতীয় ওষুধ দেওয়া চলবে না।
• ডেঙ্গু হলে শরীরে পানির পরিমাণ কমে যায়, তাই যথেষ্ট পরিমাণ পানি, শরবত, ডাবের পানি, অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার দিতে হবে।
• রোগী খেতে না পারলে স্যালাইন দিতে হবে। প্যাকেটজাত ফলের রস বা হেল্থ ড্রিঙ্ক খাওয়াতে গেলে হিতে বিপরীত হবে।
• যদি রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, পালস রেট বেড়ে যায়, প্রস্রাব কমে যায়, শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত বেরোতে থাকে, তাহলে দেরি না করে হাসপাতাল বা নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
শিশুদের ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে করণীয়
ডেঙ্গু প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধের দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
শিশুদের ডেঙ্গু রোগ হওয়া থেকে বাঁচাতে শুরুতেই এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেন তাদের মশা না কামড়ায়। এ ব্যাপারে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আবু তালহা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন।
১. প্রথম পরামর্শ হলো, এডিস মশার উৎস ধ্বংস করতে হবে। এডিস মশা সাধারণত গৃহস্থালির পরিষ্কার স্থির পানিতে জন্মে থাকে – যেমন ফুলের টব, গাড়ির টায়ার বা ডাবের খোলে বৃষ্টির জমা পানি ইত্যাদি। তাই এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে এমন স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে। বাড়ির আঙ্গিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
২. শিশুদের দিনে ও রাতে মশারির ভেতরে রাখতে হবে। বিশেষ করে নবজাতক শিশুকে সার্বক্ষণিক মশারির ভেতরে রাখা জরুরি। এছাড়া হাসপাতালে কোন শিশু যদি অন্য রোগের চিকিৎসাও নিতে আসে, তাহলে তাকেও মশারির ভেতরে রাখতে হবে। কেননা ডেঙ্গু আক্রান্ত কাউকে এডিস মশা কামড়ে পরে কোন শিশুকে কামড়ালে তার শরীরেও ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৩. শিশুরা যে সময়টায় বাইরে ছুটোছুটি বা খেলাধুলা করে, সে সময়টায় তাদের শরীরে মসকুইটো রেপেলেন্ট অর্থাৎ মশা নিরোধীকরণ স্প্রে, ক্রিম বা জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। এবং কয়েক ঘণ্টা অন্তর পুনরায় এই রেপেলেন্ট প্রয়োগ করতে হবে।
৪. শিশু যদি অনেক ছোট হয় বা তাদের শরীরে ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করা না যায়, তাহলে তাদের হাতে মসকুইটো রেপেলেন্ট বেল্ট বা পোশাকে প্যাচ ব্যবহার করা যেতে পারে।
৫. মশার কামড় প্রতিরোধে আরেকটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হতে পারে শিশুদের ফুল হাতা ও ফুল প্যান্ট পরিয়ে রাখা।
৬. তবে মশা প্রতিরোধ অ্যারোসল, মশার কয়েল বা ফাস্ট কার্ড শিশু থেকে শুরু করে সবার জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। এর পরিবর্তে মসকুইটো কিলার বাল্ব, ইলেকট্রিক কিলার ল্যাম্প, ইলেকট্রিক কয়েল, মসকুইটো কিলার ব্যাট, মসকুইটো রেপেলার মেশিন, মসকুইটো কিলার ট্র্যাপ ইত্যাদির সাহায্যে নিরাপদে মশা ঠেকানো যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে এই সরঞ্জামগুলো যেন শিশুর নাগালের বাইরে থাকে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন মিস্টার তালহা।
৭. যদি শিশুর মা ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে সেই ভাইরাসের কোন প্রভাব মায়ের বুকের দুধে পড়ে না। কাজেই আক্রান্ত অবস্থায় মা তার বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন।
ডেঙ্গুর পর যে খাবার দুর্বলতা কাটাতে পারে
বিভিন্ন ফল ও সবজি। ছবি: সংগৃহীত
দেশে চলতি বছর প্রতিদিন ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়েই চলছে। এমনকি কিছুটা উপসর্গে পরিবর্তন আসায় শনাক্ত হচ্ছে বেশ পরে। এই আবহাওয়ায় ডেঙ্গু হলে শরীর দুর্বল হওয়াটা স্বাভাবিক। ছোট-বড় সব বয়সী রোগীরই ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর দুর্বল হয়ে পড়ছে শরীর। তাই দুর্বলতা কাটাতে চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবারের প্রতিও নজর রাখতে হবে।তাহলে জেনে নেওয়া যাক, ডেঙ্গুর পরবর্তী দুর্বলতা কাটাতে কী কী খাবার খাওয়া জরুরী
ডাবের পানি: ডেঙ্গু হলে ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি ডাবের পানি পান করা ভালো। এতে শরীরে যে যে খনিজের ঘাটতি দেখা যায়, তার বেশির ভাগটাই পূরণ হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াও প্রয়োজন।
কলা: ডেঙ্গুর জ্বরের পর পানি শূন্যতা দেখা দিতে পারে। এজন্য নজর রাখতে হবে কোনোভাবেই যেন শরীরে পানির ঘাটতি না হয়। তাই পানি বা তরলজাতীয় খাবার খাওয়ার পাশিপাশি, কলা খাওয়ারও পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখতে কলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পেঁপে: অনেকের ধারণা, শরীরে প্লাটিলেটের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে বিশেষ কিছু খাবার খেয়ে। তবে চিকিৎসকরা বলেন, এই ধারণার তেমন কোনো ভিত্তি নেই। তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার জন্য নিয়মিত পাকা পেঁপে খাওয়া যেতেই পারে।
বেদানা: রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলার জন্য খেতে পারেন বেদানার রস। এতে প্রতিরোধ শক্তি এবং রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। বেদানা বা ডালিম খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা বেড়ে যায় অনেকের। সেজন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থাও নিতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
কাঠবাদাম: ডেঙ্গুর পর শরীরের দুর্বলতা কাটাতে কাঠবাদাম কার্যকরী ফল দিতে পারে। এতে অ্যামাইনো অ্যাসিড, ভিটামিন, প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটে ভরপুর কাঠবাদাম শরীরের জন্য খুবই উপকারী। তাছাড়া ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি এর ঘাটতি পূরণেও সাহায্য করে কাঠবাদাম।
ডেঙ্গুর ঘরোয়া চিকিৎসা
প্রকৃতিক উপাদানকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই ডেঙ্গু জ্বরকে কাবু করা সম্ভব।
কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের ডেঙ্গু জ্বরকে কাবু করা সম্ভব। যেমন—
* বিশ্রাম নিন এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন অথবা তরল জাতীয় খাবার খান। শরীর হাইড্রেটেড থাকলে মাথাব্যথা ও পেশি ব্যথা কম হবে।
* প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে পেঁপে পাতার রস পান করুন, কারণ ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট কমে যায়। পেঁপে পাতার রস সংক্রমণ তাড়ানোর ক্ষমতাও বাড়াতে পারে।
* পেয়ারার শরবত পান করুন। এই পানীয়ের ভিটামিন সি রোগদমনতন্ত্রকে শক্তিশালী করে ডেঙ্গু সংক্রমণ উপশম করবে।
* এক মগ গরম পানিতে মেথি বীজ ভিজিয়ে পানীয়টি ঠান্ডা করে পান করুন। এতে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ন্ত্রণে থাকবে ও রোগ উপশমের ক্ষমতা বাড়বে।
* রোগের বিরুদ্ধে ভালো লড়াই করে এমন খাবার বেশি করে খান, যেমন- সাইট্রাস ফল, কাঠবাদাম, দই, সূর্যমুখী বীজ, গ্রিন টি, ক্যাপসিকাম, ব্রোকলি, পালংশাক, আদা, রসুন ও হলুদ।শক্তিশালী রোগদমনতন্ত্রের কাছে সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ সহজেই পরাস্ত হয়।
* রক্তের প্লাটিলেট বাড়াতে নিম পাতার রসও পান করতে পারেন। এটি শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যাও বৃদ্ধি করে। নিম পাতার রোগদমন ক্ষমতা বর্ধক শক্তিও আছে।
* তুলসি পাতাকে গোল মরিচের সঙ্গে পানিতে সিদ্ধ করে পানীয়টিকে ঠান্ডা করে পান করতে পারেন। এটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে ভালো লড়াই করতে পারে। তুলসি পাতা চাবালেও রোগদমনতন্ত্র শক্তিশালী হবে।
* ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পুদিনা পাতার রসও বেশ কার্যকর। এটি সংক্রমণের জ্বর কমাতে পারে, রোগদমনতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে এবং প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে পারে।
* ডেঙ্গু উপশমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো বার্লি চা। এটি ভিটামিন বি১, ভিটামিন বি২, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২, ফোলেট, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড ও মিনারেলে সমৃদ্ধ। এসবকিছু রক্তের প্লাটিলেট ও লোহিত রক্তকণিকা বাড়াতে একত্রে কাজ করে।
গর্ভবতী নারীদের জন্য ডেঙ্গুর হুমকি: বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য সংকট সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারীদের জন্য ডেঙ্গু আরও বেশি বিপজ্জনক। বাংলাদেশে বর্তমানের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা, যারা বলছেন যে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে মা এবং তার অনাগত সন্তানের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে গর্ভবতী নারীদের
ডেঙ্গু রোগ সাধারণত একটি ভাইরাসজনিত জ্বর, যা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে রক্তকণিকা ও প্লাটিলেট কমিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় যদি মায়ের প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যায়, তাহলে রক্তপাতের আশঙ্কা বেড়ে যায়। ডেঙ্গু আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর জন্য এর পরিণতি হতে পারে গর্ভপাত, সময়ের আগে ডেলিভারি অথবা গর্ভে সন্তানের মৃত্যু—যদি চিকিৎসা যথাসময়ে না করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনোকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. তৃপ্তি রানী দাস বলেন, “গর্ভবতী নারীদের শরীরের তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে উঠতে দেওয়া উচিত নয়। তাপমাত্রা বাড়লে সন্তানের হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়, যা বিপজ্জনক।”
তিনি আরও জানান, গর্ভবতী নারীদের জন্য যে কোনো জ্বর—বিশেষ করে ডেঙ্গু—ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রথম লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে গর্ভবতী নারীর যত্ন নেওয়া পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব। বাংলাদেশ ইনফার্টিলিটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান এসএম খালেদুজ্জামান বলেন, “সামান্য অসতর্কতা বড় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। পরিবারকে গর্ভবতী নারীর প্রতি বিশেষ যত্নবান হতে হবে।”
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন
• বাড়ির চারপাশে মশার প্রজননস্থল দূর করা।
• গর্ভবতী নারীর শরীরের তাপমাত্রা ও প্লাটিলেট কাউন্ট নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
• ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।
গর্ভবতী নারীদের জন্য ডেঙ্গু একটি বড় চ্যালেঞ্জ, এবং এটি মোকাবেলায় সমাজের প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে। রোগ প্রতিরোধ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।
গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা আমাদের সবার কর্তব্য। স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং ডেঙ্গু মোকাবেলার জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
ডায়াবেটিস রোগীর ডেঙ্গু হলে যা করতে হবে
যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাঁদের ডেঙ্গু হলে বিশেষ কিছুু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
ডেঙ্গু এডিস মশা বাহিত রোগ। ডেঙ্গু ভাইরাস চার ধরনের। একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও অন্য ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। আর এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রেই তা মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে গত কয়েক বছর ধরে সারা বছরই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। শহর অঞ্চলের পাশাপাশি এখন তা গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট করে চিকিৎসা নেই। সাধারণত সাত দিনের মধ্যেই ডেঙ্গু সেরে যায়। তবে অনেকের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এর মত অবস্থা দেখা দেয় যা থেকে মৃত্যু হতে পারে।
সাধারণত ডায়াবেটিস, স্থূলতা, কিডনি বা লিভারের জটিলতা, অন্তঃসত্ত্বা থাকলে ডেঙ্গুর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে অন্যান্য রোগের মত ডায়াবেটিস রোগীদের অধিক সচেতন হতে হবে।
১. জ্বর হলেই চিকিৎসকের পরামর্শে আনুষঙ্গিক পরীক্ষা করিয়ে ফেলুন। এবারের ডেঙ্গু জ্বর আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে বহুল প্রচলিত ঘঝ১ নেগেটিভ আসছে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
২. পরিপূর্ণভাবে বিশ্রাম নিতে হবে।
৩. পর্যাপ্ত পরিমাণে চিনি ছাড়া তরল জাতীয় খাবার (ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, লেবু পানি, সুপ) গ্রহণ করতে হবে।
৪. ডেঙ্গুতে জ্বরের সঙ্গে বমি ও পাতলা পায়খানা হলে অবশ্যই ওরস্যালাইন খেতে হবে। পাতলা পায়খানার জন্য অযথা সিপ্রোফ্লক্সাসিন, মেট্রোনিডাজল, এজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ খাবেন না।
৫. রক্তের শর্করার মাত্রা ৪-৬ ঘণ্টা অন্তর অথবা প্রয়োজনানুসারে আরও অধিকবার পরীক্ষা করতে হবে। সেই সঙ্গে সম্ভব হলে স্ট্রিপের মাধ্যমে প্রস্রাবে কিটোনের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে হবে।
৬.সময়মতো ও যথাযথভাবে খাবার খেতে হবে। অরুচি বোধে প্রয়োজনে বারবার খেতে হবে।
৭. ইনসুলিন বা ওষুধ নিয়ে সময়মতো না খেলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৮. প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ বা ইনসুলিন এর মাত্রা নির্ধারণ করে নিন।
৯.ব্যথার জন্য অ্যাসপিরিন, ক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন–জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করলে রক্তক্ষরণ হতে পারে।
১০. জ্বর ও ব্যথা উপশমে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ওষুধ নয়।
১১. লিভার, হার্ট এবং কিডনি জটিলতা থাকলে প্যারাসিটামল সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
১২.রক্তের প্ল্যাটিলেট নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না। জ্বর কমে যাওয়ার পর সংকটকাল পেরিয়ে গেলে আপনা থেকেই প্লাটিলেট বাড়তে শুরু করে।
১৩.শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনার জন্য কিছু পরীক্ষা বারবার করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসককে সহায়তা করুন। না জেনে অযথা ভুল মন্তব্য করবেন না।
১৪. অতিরিক্ত বমি বা পাতলা পায়খানা, অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা, পেটে ব্যথা, পায়খানা বা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাত, শরীরের বিভিন্ন অংশে, যেমন মাড়ি ও নাক থেকে রক্তপাত, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ কমে গেলে, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকলে, অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।