সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, সত্য ও মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর এক নিরন্তর দায়বদ্ধতার নাম। সেই দায়বদ্ধতাকে হৃদয়ে ধারণ করে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় সক্রিয় রয়েছেন এনায়েত হোসেন মিঠু। সংবাদকর্মী হিসেবে তিনি যেমন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন, তেমনি নাট্যচর্চা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। মিরসরাইয়ের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘ পথচলা তাঁকে দিয়েছে এক বহুমাত্রিক পরিচয়।
শৈশব, পরিবার ও শিক্ষাজীবন
এনায়েত হোসেন মিঠু জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮১ সালের ২৩ নভেম্বর। তাঁর বাবা মরহুম কবির আহম্মেদ ভূঁইয়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (মেরিন) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মা মরহুম সকিনা বেগম ছিলেন একজন গৃহিণী। তিন বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে মিঠু ছিলেন ছোট।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও সংস্কৃতিমনা। ১৯৯৭ সালে মিঠাছরা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করেন। এরপর ১৯৯৯ সালে মিরসরাই কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ২০০১ সালে একই কলেজ থেকে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন।
সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পদচারণা
সাংবাদিকতার পাশাপাশি এনায়েত হোসেন মিঠুর রয়েছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ। মিরসরাইয়ের সাহিত্যচর্চার অন্যতম সংগঠন মিরসরাই কবিতা পরিষদ-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে তিনি সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৯৯ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন ক্রীড়া, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন অংকুর। সংগঠনটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে একাধিকবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় লিটল ম্যাগাজিন ‘সময়’, যা সে সময়ের স্থানীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাহিত্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে কবিতাতেও। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘প্রেম ও প্রকৃতি’ উল্লেখযোগ্য। কবিতায় প্রেম, প্রকৃতি ও জীবনবোধের নানা অনুষঙ্গ তাঁর সৃজনশীল মননের পরিচয় বহন করে।
নাট্যচর্চায় এক সক্রিয় মুখ
মিরসরাইয়ের নাট্যাঙ্গনেও এনায়েত হোসেন মিঠু পরিচিত একটি নাম। নাট্যরচনা ও নির্দেশনা—দুই ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘প্রজন্ম একাত্তর’, ‘একুশ থেকে একাত্তর’ এবং ‘মৌলভীর মন ভালো নেই’।
তাঁর নির্দেশনায় মঞ্চায়িত হয়েছে অন্তত ছয়টি নাটক। এর মধ্যে ‘পাতা কুড়ানির দল’, ‘শিল্পী’, ‘মৌলভীর মন ভালো নেই’, ‘প্রজন্ম একাত্তর’, ‘একুশ থেকে একাত্তর’ এবং ‘একে ধরিয়ে দিন’ উল্লেখযোগ্য।
নাট্যচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং ইতিহাস, সমাজ, মূল্যবোধ ও মানুষের জীবনসংগ্রামকে মঞ্চে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন। তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা।
সাংবাদিকতায় পথচলা
এনায়েত হোসেন মিঠুর সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ১৯৯৮ সালের শেষদিকে। ইকবাল আহমেদ সম্পাদিত দৈনিক মুক্তকণ্ঠ-এর মিরসরাই প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সাংবাদিকতায় আত্মপ্রকাশ করেন। তখন থেকেই সংবাদ সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরা এবং মানুষের কথা বলার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে দৈনিক জনকণ্ঠ ও দৈনিক পূর্বকোণ-এর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাজের পরিধিও বিস্তৃত হতে থাকে।
২০১২ সালের শুরুর দিকে তিনি যোগ দেন দৈনিক কালের কণ্ঠ-এ মিরসরাই প্রতিনিধি হিসেবে। মাঠপর্যায়ের সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সাহসী সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেন। তাঁর পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে তিনি কালের কণ্ঠের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক প্রতিনিধি হিসেবে পদোন্নতি পান।
পরবর্তীতে গণমাধ্যমের পরিবর্তিত বাস্তবতায় মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার গুরুত্ব বাড়তে থাকলে তিনিও নিজেকে সেই ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে তিনি কালের কণ্ঠ মাল্টিমিডিয়া চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন।
সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে ভূমিকা
পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাংবাদিকদের সংগঠিত করা এবং তাঁদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রেও এনায়েত হোসেন মিঠু সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
মিরসরাই প্রেস ক্লাবের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। তিনি সংগঠনটির দুইবার সাধারণ সম্পাদক এবং একবার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি মিরসরাই প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংগঠনের দায়িত্বে থাকাকালে তিনি সাংবাদিকদের পারস্পরিক ঐক্য, পেশাগত শৃঙ্খলা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করেছেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকদের সংগঠন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং সহকর্মীদের স্বার্থ ও পেশাগত নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সাহসী পদচারণা
দীর্ঘ ২৭ বছরেরও বেশি সাংবাদিকতা জীবনে এনায়েত হোসেন মিঠুকে বহু কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়কালে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, চেয়ারম্যান ও পুলিশের বিরুদ্ধে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারণে তাঁকে একের পর এক মামলার মুখোমুখি হতে হয়।
এই সময়ে তিনি মোট ছয়টি মামলার আসামি হন। সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের কারণে মামলা-মোকদ্দমার দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। তবে তিনি পেশাগত অবস্থান থেকে সরে আসেননি। পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালত এসব মামলায় এনায়েত হোসেন মিঠু এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রকাশক, সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকদের খালাস দেন।
তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রণীত আইসিটি অ্যাক্টে দায়ের হওয়া একটি মামলা। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি তাঁর চার সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সেই মামলার আইনি লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞ আদালত এনায়েত হোসেন মিঠু ও তাঁর চার সহকর্মীকে খালাস দেন।
এই ঘটনাগুলো তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের প্রতিকূলতার একটি দিক তুলে ধরে। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে চাপ, মামলা কিংবা নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা এলেও তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালনে পিছপা হননি—এটাই তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আলোচিত প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা
এনায়েত হোসেন মিঠুর সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম শক্তিশালী দিক তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। স্থানীয় পর্যায়ের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভূমি দখল, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং সাধারণ মানুষের বঞ্চনার মতো বিষয় তাঁর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘সোনা নিয়ে পুলিশি কাণ্ডে হুলস্থুল’, ‘সোনা কত মধুরে’, ‘চট্টগ্রামের জোড়া খুনের নেপথ্যে এসআই ইয়ার’, ‘নাকফুল বেচে আওয়ামী লীগ নেতার উৎসবের চাঁদা’, ‘চতুর এমপির দাপুটে ভাতিজা’, ‘চরাঞ্চলের হাজার একর জমি এমপির কব্জায়’, ‘অবৈধভাবে পানি তুলছে ভারত’, ‘কেন্দ্র ফাঁকা, বাক্স ভরা’, ‘মনোনয়নপত্র জমা দিলে খবর আছে’, ‘শ্রমিকের টাকায় আওয়ামী লীগ নেতার ভাগ’, ‘তিন ফসলি বিলে কালো চোখ’, ‘সোনাপাহাড়জুড়ে জঙ্গিজাল বিস্তার’, ‘এ কালের নূরজাহান মিরসরাইয়ের আসমা’, ‘হত্যার পর পুড়িয়ে দেওয়া হলো লাশ’, ‘এত ওজন সইতে পারছে না সড়ক’, ‘বিজিএমই’র প্লট নিয়ে বেজায় কারসাজি’ এবং ‘তৃতীয় শ্রেণির মাহফুজ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন’।
এসব প্রতিবেদনের বিষয়বৈচিত্র্য থেকেই বোঝা যায়, তাঁর সাংবাদিকতার পরিধি কেবল ঘটনাভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঘটনার অন্তরালে থাকা বাস্তবতা সামনে আনার চেষ্টা করেছেন।
সাংবাদিকতার বাইরে একজন সংগঠক
এনায়েত হোসেন মিঠুর পরিচয় তাই শুধু সাংবাদিক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন সংগঠক, নাট্যজন, সাহিত্যকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং শিক্ষানুরাগী। মিরসরাইয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি তাঁকে দিয়েছে ভিন্ন এক পরিচিতি।
একদিকে সংবাদপত্রের জন্য মাঠে ছুটে বেড়ানো, অন্যদিকে সাহিত্য ও নাট্যচর্চায় যুক্ত থাকা—এই দুই ধারাকে তিনি দীর্ঘদিন পাশাপাশি এগিয়ে নিয়েছেন। তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি বিষয় সবসময় স্পষ্ট—নিজের জন্য নয়, বরং একটি জনপদ, তার মানুষ এবং সেই সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য কিছু করার তাগিদ।
এক দীর্ঘ পথচলার নাম এনায়েত হোসেন মিঠু
১৯৯৮ সালের শেষদিকে সাংবাদিকতায় পা রাখার পর দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ২৭ বছরেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ সময়ে বদলেছে সংবাদমাধ্যমের ধরন, প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে সাংবাদিকতার ভাষা ও কর্মপদ্ধতি। কিন্তু মানুষের কথা বলার যে দায়, সত্য অনুসন্ধানের যে তাগিদ এবং সমাজের অসংগতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার যে সাহস—সেটিই এনায়েত হোসেন মিঠুর সাংবাদিকতা জীবনের মূল সুর হয়ে আছে।
মিরসরাইয়ের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সাংবাদিকতা এবং পরবর্তীতে মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছানো তাঁর এই পথচলা নিঃসন্দেহে সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা ও অর্জনের এক দীর্ঘ অধ্যায়।
সাংবাদিক এনায়েত হোসেন মিঠুর জীবন তাই কেবল একজন সংবাদকর্মীর পেশাগত জীবনের গল্প নয়; এটি একটি জনপদের সঙ্গে বেড়ে ওঠা, মানুষের কাছাকাছি থাকা, সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য কাজ করা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের বিশ্বাস ও পেশাগত দায়িত্বকে ধারণ করে এগিয়ে চলার গল্প।
সময় বদলাবে, সংবাদমাধ্যমের রূপ বদলাবে, প্রযুক্তির সঙ্গে সাংবাদিকতার ভাষাও বদলে যাবে। কিন্তু একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় থেকে যায় তাঁর কাজের মধ্যে—তিনি কতটা সত্যের কাছে থেকেছেন, কতটা মানুষের কথা বলেছেন এবং কতটা সাহস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেই বিচারে এনায়েত হোসেন মিঠুর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন তাঁর নিজস্ব কর্মময়তার এক স্বতন্ত্র সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।


