তীব্র শীতে নিস্তব্ধ পাহাড়, নাকাল জনজীবন

চারদিকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা। কোথাও কোন জন-মানব নেই। যাও দু-একজন পথ চলছেন কুয়াশার কারণে দেখতে পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। সকাল পেরিয়ে বিকেল তবুও নেই সূর্যের দেখা। কাজ কর্ম ছেড়ে মানুষজন শীতের সাথে লড়াইয়ে ব্যস্ত! যে কয়েকজন কাজের জন্য বেরিয়েছেন তাদের অবস্থাও একেবারে কাহিল। সব মিলিয়ে গত ২ দিন টানা সূর্যের দেখা না মেলায় পাহাড়ি জনপদের জেলা রাঙামাটিতে নেমেছে প্রচণ্ড শীত। আর শীতে চরম বিপাকে পড়েছেন খেটে-খাওয়া অসহায়, দিন মজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা। এ অবস্থায় তারা কনকনে ঠান্ডা শীত থেকে রক্ষার জন্য আগুন জ্বালিয়ে ঠান্ডা নিবারণের চেষ্টা করছেন।

রোববার (৪ জানুয়ারি) জেলার বরকল, লংগদু, নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়ি সহ পাশ্ববর্তী জেলা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা এবং সদর উপজেলার খোঁজ খবর নিয়ে ও সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।

দিনে রাতে ঘন কুয়াশা এবং হিমেল হাওয়ায় জনজীবন নাকাল হয়ে পড়েছে। কুয়াশা ও পশ্চিমা বাতাসের কারণে বোরো বীজতলা ও শীতকালীন বিভিন্ন আবাদ নিয়ে কৃষকরা চিন্তিত হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে কৃষি দপ্তরের সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ না থাকায় রবি মৌসুমে রবি শস্যর ঠান্ডাজনতি বালাই নিয়ে বিপাকে পরেছে কৃষক। কনকনে ঠান্ডার কারণে দরিদ্র শীতার্ত মানুষের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়েছে।
তীব্র শীতে নিস্তব্ধ পাহাড়, নাকাল জনজীবন 1

এদিকে জেলার সদর হাসপাতাল-সহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বাড়ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। অন্যদিকে শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্টে পড়েছে হ্রদ পাড়ের অসহায় হতদরিদ্র ছিন্নমূল ও স্বল্প আয়ের কর্মজীবী মানুষ। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাহিরে বেরোচ্ছেন না। কনকনে ঠান্ডা শীতের দাপটে শহর ও গ্রামাঞ্চলসহ দূর্গম এলাকার বহু দরিদ্র অসহায় মানুষ আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পাহাড়ে শীতের দাপট আরও বেশি অনুভূত হতে পারে। গত দুই দিনে আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। লংগদুসহ আশপাশের এলাকায় তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌছাছে।
তীব্র শীতে নিস্তব্ধ পাহাড়, নাকাল জনজীবন 2

এদিকে তীব্র ও ঠান্ডা শীতের কারণে নিম্ন আয়ের খেটে-খাওয়া মানুষগুলোর কাজের অভাব দেখা দিয়েছে। খেটে-খাওয়া মানুষেরা ঠিকমত নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে না পেরে বেকায়দায় পড়েছেন তারা। ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠান্ডার কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ক্রেতা-বিক্রেতাও কমে গেছে।রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল করছে ধীর গতিতে। দূরপাল্লার যানবাহনগুলো দিনের বেলা হেড লাইট জ্বালিয়ে চলতে হচ্ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে।

শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিন্নমূল মানুষ ও খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগের সীমা নেই। উপজেলার মাইনীমূখ ইউনিয়নের ইসলামাবাদ এলাকার আটো রিকশা চালক নয়ন মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, যে ঠান্ডা শীত এখন বেলা ১২টা বাজে এ পর্যন্ত কোনো যাত্রী পেলাম না। রিকশা চালিয়ে টাকা আয় করতে না পারলে পরিবারসহ না খেয়ে থাকবে হবে।

একই এলাকার শ্রমিক হেলাল মিয়া জানান, ঠান্ডায় হাত পা শীতল হয়ে আসছে। মাটির ঝুড়ি মাথায় তুলতে কষ্ট হচ্ছে। কনকনে শীতে পায়ে হেঁটে ডালি নিতে কষ্ট হয়। শীত বেশি পড়ায় শ্রমিক অর্ধেকও কাজে আসেনি।

ব্যবসায়ীরা বলেন, দু”দিন থেকে ঠান্ডা খুববেশী অনুভব হচ্ছে। দিন দিন কুয়াশার সঙ্গে ঠান্ডার মাত্রা বেশি হচ্ছে। সন্ধ্যার পর থেকেই উত্তরের ঠান্ডা বাতাস আর কনকনে শীতে জনজীবনে অনেকটা ভোগান্তি বেড়েছে। গরীব অসহায় দিন মজুর প্রচণ্ড ঠান্ডায় কাজে যেতে না পেরে অনেকটা দিশেহারা। শীত নিবারণের জন্য মোটা গরম কাপড় পড়তে হচ্ছে তবুও ঠান্ডা নিবারণ হচ্ছে না। সন্ধ্যা থেকেই এখন গায়ে মোটা জামা কাপড়ে পরেও শীত নিবারণ সম্ভব হয় না। রাতে ঠান্ডায় দুঃস্থ অসহায় মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। শীত বস্ত্র না থাকায় তাদের প্রতি রাতে কষ্টে কাটাতে হচ্ছে। রাতে ও সকাল হলে বাড়ির সামনে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন বয়োঃবৃদ্ধ, যুবক, শিশু শ্রমজীবী মানুষ।
তীব্র শীতে নিস্তব্ধ পাহাড়, নাকাল জনজীবন 3

বগাচতর ইউনিয়নের গাউসপুর এলাকার কৃষক আমজাদ আলী বলেন, আগের থেকে অনেক বেশি ঠান্ডা পড়েছে। শীত অনেক কষ্টে আছি সকালে কাজে গেলে প্রচুর ঠান্ডা লাগে, কাজ করতে খুবই কষ্ট হয়। দিনের বেলাতে সূর্যের দেখা নাই। সন্ধ্যার পর থেকে ঠান্ডা বাড়ে। সকালে কাজে যেতে পারি না ঠান্ডায় কারণে।

ব্যবসায়ী শফিকুল বলেন, প্রতিদিন সকালে দোকান খুলি। এখন প্রচণ্ড ঠান্ডা, কষ্ট হলেও জীবন জীবিকার তাগিদে ব্যবসার কাজ করতে হয়। আজ আগের থেকে বেশি ঠান্ডা পড়েছে। হাত পা টনটন করছে, কাস্টমার নেই। এই ঠান্ডায় তেমন কেউ বাহিরে বের হয় না, তাই বেঁচা-বিক্রি নেই। এভাবে চলতে থাকলে দোকান ব্যবসা লাটে উঠবে। আরও বলেন, গত সপ্তাহে যে রোজগার করেছি তার অর্ধেক এখন হয় না। ভাড়া তেমন নেই আজ সারাদিনে এখনও কোনো ভাড়া পাইনি জানান স্থানীয় মোটরসাইকেল চালক।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা গেছে, শীতজনিত রোগের কারণে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়েছে। কনকনে শীতে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু ও বৃদ্ধরা। শীত জনিত কারণে শ্বাসকষ্ট জনিত বিভিন্ন রোগে বয়োবৃদ্ধ ও নিউমোনিয়া-ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।

লংগদু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, সরকারি বরাদ্দ এসেছে। এ পর্যন্ত আমরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শীতবস্ত্র কম্বল বিতরণ করেছি। শীতার্ত মানুষগুলোর কষ্ট লাঘবে সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা জরুরি।

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।