হার্টের রক্তনালিতে ব্লক শনাক্তে আধুনিক পদ্ধতি করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি

0

হৃদযন্ত্র আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গের জন্য রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনিতে চর্বি ও অন্যান্য উপাদান জমে রক্তনালি সরু বা বন্ধ হয়ে গেলে তৈরি হতে পারে করোনারি আর্টারি ডিজিজ। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অল্প পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়া কিংবা হার্ট অ্যাটাকের মতো গুরুতর সমস্যা এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে হৃদযন্ত্রের রক্তনালির অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি (Coronary Angiography) একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি হলো এমন একটি বিশেষায়িত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের রক্তনালিগুলোর ভেতরের অবস্থা সরাসরি দেখা যায়। সাধারণত হাতের কবজি বা কুঁচকির একটি রক্তনালির মাধ্যমে সরু ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে সেটিকে করোনারি ধমনির কাছে নেওয়া হয়। এরপর বিশেষ ধরনের কনট্রাস্ট ডাই প্রয়োগ করে এক্স-রে বা ফ্লুরোস্কোপির মাধ্যমে রক্তনালির ছবি নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কোথায় ব্লক রয়েছে, ব্লকের মাত্রা কতটা এবং কোন রক্তনালি কতটা আক্রান্ত—এসব বিষয়ে চিকিৎসক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পান।

করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি শুধু হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে ব্লক আছে কি না তা জানার পরীক্ষা নয়; এটি রোগীর পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রোগীর উপসর্গ, অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফল এবং সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করে কখন অ্যাঞ্জিওগ্রাফি প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা হয়।

সাধারণত বুকের ব্যথা বা চাপ, পরিশ্রমের সময় শ্বাসকষ্ট, অল্প পরিশ্রমেই অতিরিক্ত ক্লান্তি, পূর্বে হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস কিংবা অন্যান্য পরীক্ষায় হৃদরোগের সন্দেহ দেখা দিলে চিকিৎসক করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফির পরামর্শ দিতে পারেন। বিশেষ করে কোনো রোগীর হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ থাকলে এবং জরুরি ভিত্তিতে করোনারি রক্তনালির অবস্থা জানা প্রয়োজন হলে এই পরীক্ষা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে সবার জন্য অ্যাঞ্জিওগ্রাফি প্রয়োজন হয় না; রোগীর অবস্থার ভিত্তিতেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি একটি তুলনামূলকভাবে প্রচলিত ও নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা পদ্ধতি হলেও এটি একটি ইনভেসিভ পরীক্ষা। তাই পরীক্ষা করার আগে রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, নিয়মিত ওষুধ, অ্যালার্জি, কিডনির কার্যক্ষমতা এবং অন্যান্য শারীরিক বিষয় বিবেচনা করা হয়। পরীক্ষা শেষে কিছু সময় পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী চিকিৎসার পথও দ্রুত নির্ধারণ করা যায়। রক্তনালিতে উল্লেখযোগ্য ব্লক শনাক্ত হলে রোগীর জন্য উপযুক্ত হলে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি ও স্টেন্টিংয়ের মতো ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা করা যেতে পারে। ফলে রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়।

এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম হৃদরোগের বিশ্বমানের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করছে। হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাশাপাশি আধুনিক ক্যাথ ল্যাব, প্রয়োজনীয় কার্ডিয়াক ডায়াগনস্টিক সুবিধা, করোনারি কেয়ার ইউনিট (CCU), কার্ডিওথোরাসিক আইসিইউ এবং ২৪ ঘণ্টার জরুরি চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। রোগীর প্রাথমিক মূল্যায়ন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি, ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা, পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও ফলো-আপ—প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সেবা সমন্বিতভাবে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

হৃদরোগের ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষা করানো নয়, সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা করানোই গুরুত্বপূর্ণ। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগের অন্য কোনো সতর্কসংকেত দেখা দিলে তা অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি হৃদযন্ত্রের রক্তনালির প্রকৃত অবস্থা বুঝতে এবং পরবর্তী চিকিৎসার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক
এমবিবিএস, এমডি (কার্ডিওলজি)
সিনিয়র কনসালট্যান্ট, কার্ডিওলজি
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।