আমি জানি আমার এই লেখা পড়ার পর ফেসবুকের প্রিটেনশাস জ্ঞানমাস্তানরা আমাকে নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করবে, হতে পারে এটা তাদের আইডিয়াল ইগো। হতে পারে তাদের অনেকেই ‘লেখক’ ও ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ কিংবা ধর্মীয় উগ্রবাদী কেউ। এ নিয়ে আমি কুন্ঠিত নই।
সমস্য হচ্ছে এক শ্রেণীর নির্বোধ পাঠক আছে, ‘বিগ অডিয়েন্স’ ও ‘বিগ ক্রাউড অভ স্টুপিড পিপল’ এদের কাছে একই জিনিস। যা শোনে, তাতেই বিশ্বাস স্থাপন করে। কোনো প্রশ্ন করে না। এরা চোখ বুজে সলিমুল্লাহ খান এর মতামত, অর্থাৎ সলিমুল্লাহ খান এর ছুরিকে বিশ্বাস করছে। এদের ধারনা সলিমুল্লাহ খান এ যুগের শ্রেষ্ঠ পন্ডিত ব্যক্তি।কিছু ক্ষেত্রে, নির্বোধ পাঠক তাকে দেবাসনে বসাতে চায়, তাদের প্রোফেটাইজেশন বা নবীকরণ এর বিরুদ্ধেই আমার শক্ত অবস্থান।
ড.সলিমুল্লাহ খানকে অনেকেই লেখক, গবেষক, চিন্তাবিদ,জ্ঞানসাধক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত করেন।তিনি ছাত্র জীবন থেকেই প্রবল আত্মবিশ্বাসী, দুর্দান্ত মেধাবী ছিলেন সেটাও সঠিক।তিনি প্রথাবিরোধী লেখক, তাঁর বিভিন্ন সেমিনার, আলোচনা, টেলিভিশনে টকশো ও তর্ক-বিতর্কে নানান বিষয়ে জ্ঞানের পরিধির বিশালতার ব্যাপ্তি দেখা যায়।তিনি একজন জ্ঞানশীল দূরদর্শী চিন্তাবিদ ও একজন পরিশ্রমী গবেষক।তিনি একজন সমাজচিন্তক, বিশ্লেষক এবং সাহিত্যের সমালোচক।
একশ্রেণীর পাঠক তাকে নিয়ে নানান বিশেষণ দিয়ে থাকেন।আমিও মানছি যে,তিনি একজন মেধাবী মানুষ, তবে তিনি কতোটা সত্য কথা বলেন সেটাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি জাতিকে ভুল তথ্য দিয়ে ক্রমশ বিভ্রান্ত করছেন এ বিষয়টিও অনেকে খতিয়ে দেখেন না।
ড.সলিমুল্লাহ খানকে নিয়ে -আমার মত অর্বাচীন লেখকের লিখাকে পাঠক কতোটা গ্রহণ করবে জানিনা,তবুও আমার পরামর্শ থাকবে লেখাটা একবার পড়ে দেখুন।কতোটা গ্রহণ বা বর্জন করবেন সেটা নিতান্তই আপনার এখতিয়ার।যদিও ‘বুদ্ধিজীবী’ মহলে ওনাকে নিয়ে নানা মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে।আমি সেসবে যাবোনা,অতি সাধারণ ভাবে ড. সলিমুল্লাহ খান এর ব্যক্তিগত মন-মানসিকতা, বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার কথা এবং মস্তিষ্কপ্রসূত জটিলতার কথা,তার ‘আইডিয়াল ইগো’র কথা উপস্থাপন করবো।
একটা বিষয় লক্ষ্য করে দেখবেন – তিনি সবসময় একটা ন্যারেটিভ ভাবনা নিয়ে চলেন, জ্ঞানীদের বিরোদ্ধে প্রতিপক্ষের ভূমিকায় অবর্তীর্ন হন।যারজন্য তাঁর ইন্টেলেকচুয়াল পরিমণ্ডল খুবই ছোট।
নিজেকে দর্শক স্রোতা মহলে পরিচিত করার জন্য সবসময় একটা প্রথাবিরোধী আচরণ করেন।
ড.সলিমুল্লাহ খান ইচ্ছা করেই বিখ্যাত ব্যক্তিদের বিরোদ্ধে কথা বলে নিজেকে বিতর্কিত ও বহুল পরিচিত করার চেষ্টা করতেন।এই স্বভাবটা তার প্রথম থেকেই ছিল।যেমন ১৯৮১ সালে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের বক্তৃতার ওপর রিভিউ লিখলেন সলিমুল্লাহ খান । তখন ড.আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘তুমি একজন প্রবীণ অধ্যাপকের বিরুদ্ধে লিখে নিজেকে অজনপ্রিয় করে তুললা।’
ড.সলিমুল্লাহ খান এর বক্তব্যের বিষয়ে -প্রোপ্যাগান্ডা থাক আর না থাক – তিনি স্পষ্টভাবে প্রত্যেকটা কথা উচ্চারণ করে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ এর কৌশল অবলম্বন করেন। ড.সলিমুল্লাহ খানের পান্ডিত্যকে আমি অস্বীকার করবোনা।তবে তার ‘আইডিয়াল ইগো’ নিয়ে আমার বক্তব্য আছে।
তিনি ফুঁকো, লাকা , ফ্রয়েডের টিকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিয়ে যেতে পারেন, সলিমুল্লাহ খান বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, মহাত্মা আহমদ ছফা, অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার, কমরেড মুজফফর আহমদ, তারেক মাসুদ, ফিদেল কাস্ত্রো, ফরাসি মনস্তত্ত্ববিদ ও চিকিৎসক জাক লাকাঁ, কার্ল মার্কস, আন্তোনিয় গ্রামসি, তালাল আসাদ, শার্ল বোদলেয়ার, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন, মিশেল ফুকো, ফ্রানৎস ফানোঁ, লেভি স্ত্রস, এডওয়ার্ড সাঈদ, দেরিদা, প্লাতোন, জেমস রেনেল, ম্যাকিয়াভেলিসহ নানা বিখ্যাত মানুষের উপর লেখালেখি করেছেন। ডরোথি জুল্লে ও পেন্টিসারকস্কির কবিতা অনুবাদ করেছেন।
আর আমরা পাঠকেরা যেহেতু অকম্মার ঢেঁকি, কুঁড়ের বাদশাহ , নিজেদের তত্ত্ব নির্মাণ – বিনির্মাণের ইতিহাস নিয়ে বোঝাপড়া করবার আগ্রহ নাই – সলিমুল্লাহ খানের পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে ভক্তি গদগদ করে তাকিয়ে থাকতে পারি, কৃষ্ণের প্রতি রাধার নয়নে। সলিমুল্লাহ খানও সেই সুযোগটা নিচ্ছেন।
অনেকেই হয়তো জানেন ড.সলিমুল্লাহ খান এর আদর্শিক ব্যক্তি হচ্ছে লাকাঁর। লাঁকার এর গবেষণাকে জানলেই ড.সলিমুল্লাহ খান এর চরিত্রও আমাদের কাছে ষ্পষ্ট হবে।লাকাঁর ডক্টরাল থিসিস ছিলো ‘প্যারানয়া’ নিয়ে। প্যারানোয়েড সাইকোসিস অ্যান্ড ইটস রিলেশন টু দা পার্সোনালিটি। প্যারানয়া তাহলে কী? প্যারানয়া একপ্রকার মানসিক অবস্থা, যেখানে রোগী নানা ডেলিউশনকে, অর্থাৎ মিথ্যা বিশ্বাসকে, সত্য জ্ঞান করে। আমরা যেটিকে অনাকাঙ্খিত হিংসা বা আনওয়ারেন্টেড জেলাসি বলি, সেটি প্যারানোয়েড ব্যাক্তির ভেতর প্রবল মাত্রায় থাকে। সারাক্ষণ একধরণের ইগজাজারেইটিড সেলফ-ইম্পোর্ট্যান্সের ভেতর দিয়ে যায়। জানে, সে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ মানুষ, কিন্তু ডেলিউশনের প্রাবল্যে অভিনয় করতে থাকে— ‘আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ, কেবল তা-ই সত্য, যা আমি বলি ও ভাবি’। সলিমুল্লাহ খান এর মধ্যেও আপনি হিংসা, ইগো এবং সবজান্তা মনোভাব দেখবেন।
যারা ফ্রয়েডিয়ান সাইকোঅ্যানালাইসিস পড়েছেন, তারা ‘আইডিয়াল ইগো’ বিষয়টির সাথে পরিচিত থাকবেন। আইডিয়াল ইগো কী? সরল ভাষায়, আইডিয়াল ইগো হলো— আপনি মনে মনে যার মতো হতে চান, তা। অর্থাৎ আইডিয়াল ইগো একপ্রকার ইনার ইমেজ। এখন নিশ্চই বুঝতে পারছেন সলিমুল্লাহ খান এর আইডিয়াল ইগো কে? যেকোনো চক্ষুষ্মানের পক্ষেই বোঝা সম্ভব— সলিমুল্লাহর আইডিয়াল ইগো রবীন্দ্রনাথ, নোয়াম চমস্কি, ও হুমায়ুন আজাদ। তিনি এঁদেরকে উদারহস্তে ছুরি মেরেছেন, কখনো ব্যবহার করেছিলেন কলমের ধারালো চাকু, কখনো ব্যবহার করছেন জিহ্বা নামক কোমল বিষাক্ত ছুরিকা।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বলছেন— রবীন্দ্রনাথ ‘কি’ ও ‘কী’-এর ব্যবহার জানতেন না, ঠাকুর লালনের নখের সমানও নন; রিসেন্ট একটা ভিডিওতে দেখলাম, বিশ্ব বিখ্যাত আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের জনককে বলা হচ্ছে—নোয়াম চমস্কি ভাষার কিছুই জানেন না, তাঁকে অযথা পণ্ডিত ভাবা হয়; এই ধরনের মন্তব্য পাগলামোর পূর্বলক্ষণ কিনা, সেটা নিয়ে পৃথক আলোচনা হতেই পারে।
সলিমুল্লাহ খান ভাষাতত্ত্বের শিক্ষার্থী ছিলেন না, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ,হুমায়ূন আজাদ এদেরকেও উড়িয়ে দেন কেন জানেন- যাতে কট্টর ইসলাম পন্থীদের নিকট জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায়।
ড.হুমায়ূন আজাদকে বলছেন— তাঁর সব লেখা নকল, জাতীয় চোরকে জাতীয় হিরো বানিয়ে রাখা হয়েছে! এই হলো সলিমুল্লাহর ছুরি চালানোর নমুনা।
অথচ ড.সলিমুল্লাহ খান যে কতোটা হিপোক্রেট ছিলেন তার এই বক্তব্য থেকেই বুঝবেন। আজিজ সুপার মার্কেটের দোতালায় “অন্তরে” নামে একটা সুন্দর রেস্তোরাঁ ছিল। কবি সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীরা এখানে কাবাব খেতে খেতে জ্ঞানালোচনা করতেন। আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে সেই রেস্তোরাঁয় গল্প করতে গিয়ে বলেছিলেন ঢাকাকে মহানগরী বলা ঠিক না। কারণ যে মহানগরী একজন হুমায়ুন আজাদ, আহমদ ছফা বা তসলিমা নাসরীনকে সহ্য করতে রাজি না, সেটা কীভাবে মহানগরী হয়!ভিন্নমতালম্বীরা একটা মহানগরীর বিউটি।
আমরা সব সময় চাই বুদ্ধিজীবীরা যাতে আমার পছন্দের কথাটা বলেন। পছন্দের কথা শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আমাদের দেহ বড় হবে কিন্তু আমরা দুধের শিশুই থেকে যাব।
যাদের নিয়ে বিষাদাগার করেছেন আবার অন্য আড্ডায় নিজেকে উদারপন্থি হিসেবে দাড় করাচ্ছেন। অথচ তিনি আপাদমস্তক সাম্প্রদায়িক চিন্তার মানুষ।
এ কথা অনস্বীকার্য যে,টিভি টকশোর টেক্সচুয়াল আলোচনায় তিনি পারদর্শী এবং অন্য সবার থেকে শানিত।তাছাড়া টিভি টকশোতে আসার আগে তিনি প্রাসঙ্গিক বিষয়ে পড়াশোনা করে আসেন।সাথে থাকে তার অনন্য উপস্থাপন ভঙ্গী, এবং মানুষকে অপমান করার আজন্মলালিত সক্ষমতা।
২০১৩ সালের দিকে তিনি যখন দেখলেন-টিভিচ্যানেল সহ মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলি ততদিনে ফরহাদ মাজহারকে থরোলি বয়কট করা শুরু করেছে- তখন তিনি ফরহাদ মাজহারের বিরোদ্ধে বলে বুদ্ধি বিক্রী শুরু করলেন।
নইলে যে ফরহাদ মাজহারকে তিনি একসময় মহাত্মা ফরহাদ মজহার বলে উল্লেখ করতেন, তার সাথে এমন ১৮০ ডিগ্রী ইউটার্ন নেবার কোন কারণ তো আমার বুঝে আসে না।
যেকনো বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় সলিমুল্লাহ খান – একটা ধৃষ্টতাপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।তার বিভিন্ন কর্মকান্ডে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততাই স্পষ্ট।
কিছুদিন আগে দেখলাম , উনি টেলিভিশনে বলেন জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নাকি সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের সাথে গোপন আঁতাত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। উপস্থাপক, সলিমুল্লাহ সাহেবের এই ধারণার ভিত্তি কি জিজ্ঞেস করলে সলিমুল্লাহ খান বলেন, যেহেতু ওনার নাম শর্ট লিস্টেড হয়েছিল কাজেই ওনার কিছু গোপন আঁতাত তো ছিল নিশ্চয়ই। বলিহারি চিন্তা!অথচ আজীবন বামপন্থী রাজনীতির অকুণ্ঠ সমর্থক , এবং একরঙা ফুলহাতা শার্ট আর মাথার ওপরে শরীফ ছাতা ধরে টিচার্স কোয়াটার থেকে কলাভবন আর কলাভবন থেকে টিচার্স কোয়াটার যাতায়াত করা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার বিএনপি বা আওয়ামীলীগ – কোন সরকারকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিয়ে কথা বলেন নি জীবনে কোনদিন। এরশাদের আমলে তাঁকে ভিসি বানানোর প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত ছিল, কিন্তু এরশাদ সরকারের এজেন্ডা তিনি বাস্তবায়ন করতে অপারগতা জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে সরে আসেন। তাঁর নির্ভীক উচ্চারণের জন্যেই দলমত নির্বিশেষে তিনি শ্রদ্ধেয়, জাতীয় অধ্যাপক।
আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার সম্পর্কে ক্লাসে বলেন তিনি ভালো মানুষ, কিন্তু তার কথা এত লম্বা করার প্রয়োজন কি? সবাই যে সামনে ঘুমায়ে পড়ে। অর্থাৎ ফজলুল হক স্যারের বক্তব্য নিয়েও তিনি হেঁয়ালিপনা করলেন। আনিসুজ্জামান স্যার, আনু মুহাম্মদ স্যার সহ আরও অনেকের ব্যাপারে তার অনেক ব্যক্তিগত ক্ষোভ। ড.হুমায়ূন আজাদ, ড. আহমদ শরীফ স্যারকে নিয়েও নানা রকম নেতিবাচক কথা বলেন। হুমায়ূন আজাদ স্যারের ব্যাপারে সলিমুল্লাহ খান ট্র্যাশ শব্দটি উচ্চারণ করেন।ড.হুমায়ূন আজাদ স্যারের যে সৃজনশীল লেখা, সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বের যে পান্ডিত্য সলিমুল্লাহ খানের কথামালার বা লেখনির আদ্যোপান্তে কোনো সৃজনশীলতা আছে?
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর অনুবাদক, ইউজিসি প্রফেসর ফকরুল আলম স্যারের বিরুদ্ধেও অনেক ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন।ফকরুল স্যার এমন একজন শিক্ষক, যার আজীবনের আদর্শ এডওয়ার্ড সায়ীদ, কত অসংখ্য অগণিত মেধাবী ছাত্র ওনার রেফারেন্সে দেশের বাইরে বৃত্তি নিয়ে পড়তে গিয়েছে। আজ যদি প্রশ্ন করি, সলিমুল্লাহ সাহেব টিভিতে দুর্ধর্ষ বক্তৃতা করেন, ওনার রেফারেন্সে কয়জন ছাত্র বাইরে পড়তে গিয়েছে, বা কয়জন ছাত্র/ছাত্রীর চাকরি হয়েছে – সলিমুল্লাহ সাহেব কি উত্তর দেবেন?
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ‘সংস্কৃতি বাংলা’র আয়োজনে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে ‘বৈচিত্র্যে বহুত্বে বাংলার সংস্কৃতি : গ্যাঁড়াকল ও পরিত্রাণ’ শীর্ষক প্রথম পর্ব আলোচনায় তিনি বলেন- ১৯৭২ সালের প্রণীত সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো প্রতিফলন হয়নি। ২২ জানুয়ারী ২০২৫ নাগরিক কমিটির এক আলোচনায় তিনি বলেন,‘আমাদের সংবিধান বাস্তবায়ন কমিটি যখন গঠন হল, তখন তারা সবাই গিয়ে ড. কামাল হোসেন সাহেবের সঙ্গে গিয়ে দেখা করতে গেলেন। ড. কামাল হোসেন সংবিধানের কি বোঝেন?
সম্প্রতি -বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বললেন তিনি জনগণের নেতা ছিলেন না,তিনি ছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতা, জনগণের নেতা হিসাবে আমরা তাকে উপরে প্লেস করলাম কিন্তু তিনি সেই দায়িত্বভার গ্রহণ করতে তিনি যে সক্ষম নন সেটা ২৫ শে মার্চ রাতেই প্রমাণ হলো।তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে না পেরে পাকিস্তানিদের হাতে ধরা দিলেন।
কত বড় মিথ্যুক এবং জ্ঞানপাপী হলে এমনটা বলা যায়? স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর কেন মনে হলো যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে না পেরে পাকিস্তানিদের হাতে ধরা দিলেন। ধরলাম বিগত সতের বছর তিনি ভয়ে উচ্চারণ করেননি। তাহলে ৭৫ থেকে ৯৬ পর্যন্ত সময়েতো আওয়ামীলীগের ক্রান্তিকাল ছিল,ক্ষমতায় ছিলেন না, মাঝে ২০০১ হতে ২০০৬ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ ক্ষমতার বাইরে ছিল,তখন কেন এই কথাগুলো বলেননি?
আসলে এতদিন তাকে অনেকেই চিনতে পারেনি,এখন ধীরে ধীরে তার চরিত্রের কুৎসিৎ দিকগুলো উম্মোচিত হচ্ছে। এখন তার প্রতি অনেকের শ্রদ্ধার পারদ নেমে এসেছে সীমার শেষ প্রান্তে। এখন অনেকেই বলছে জাতিকে ভুল তথ্য প্রদানকারী, জ্ঞানপাপী, মিথ্যুক জনাব সলিমুল্লাহ খান!
জ্ঞান হলো বহতা নদীর মত, যত ব্যবহার,প্রবাহ হবে তত নির্মল উজ্জ্বল হবে, প্রজ্ঞা,অভিজ্ঞতা বাড়বে।
কিন্তু সেই নির্মল উজ্জ্বল বিশেষ-অজ্ঞ মস্তিস্ক বিকৃত-প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি যদি প্রবাহ হীন পঙ্কিল কালিমা লিপ্ত চর্চা বিহীন অকেজো সামাজিক গুরুত্বহীন জ্ঞান এর কথা তুলে ধরে, প্রচার বা সমর্থন করে তাদেরকে একপ্রকার জ্ঞানপাপী বলা যেতে পারে।জ্ঞানী ব্যক্তি যখন জেনে বুঝে ইচ্ছায় সজ্ঞানে হিংসায় জ্বলেপুড়ে বেকুবের মত কাজ করে তখন সে জ্ঞানী ব্যক্তি জ্ঞানপাপীতে রুপান্তর হয়।
অথবা বলা যায়,কাল্পনিক মতবাদ বা কল্পবিশ্বাসে অন্ধ, অজ্ঞ, লোভী, নৃশংস, পরশ্রীকাতর কূপমণ্ডূকরা মনে করে তাদের জানা বা জ্ঞানের বাইরে আর কিছু নেই; তাদের জানাটাই সব, তাদের কুয়োটাই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, এর বাইরে আর কিছু নেই, কোনো জ্ঞান নেই; তাদের মতবাদ ছাড়া বাকি সব ভুয়া ও বাতিলযোগ্য। এমন কূপমণ্ডুকরা প্রকৃত জ্ঞানী-বিজ্ঞানী আর সত্যান্বেষীদের জ্ঞানপাপী ডাকে।
জ্ঞানপাপীর এই ধারনা দিলাম এজন্য যে,যাতে বুঝতে সহজ হয় যে, সলিমুল্লাহ খান এর চরিত্রের সাথে এর সাযুজ্যতা রয়েছে।
মানুষকে সামনা সামনি, হাসিমুখে বাঁশ দিতে পারার একটা বিরল সক্ষমতা রয়েছে সলিমুল্লাহ খানের।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি খুব আত্ম অহংকারী, বিষোদগার করা এবং প্রোপ্যাগান্ডা ছড়ানো এবং তার মতের বাইরে গেলেই তাকে তুলাধুনা করা তার স্বভাব।
আপনি তার বই কিনলে এবং পড়লে সে খুব খুশী হবেন কিন্তু তাঁর হাতে আপনার লেখা কোনো বই দিলেই দেখবেন কিভাবে ভ্রু কুঁচকায়!
সলিমুল্লাহ খান ঢাবির আইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করলেও আইন বিভাগে চাকুরী পান নি। পেয়েছিলেন পরবর্তীতে ঢাবির আইবিএ তে। সেখান থেকে তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অ্যামেরিকা চলে যান। এক পর্যায়ে তার চাকুরী চলে যায় আইবিএ হতে।
এরপরও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছিলেন কিন্তু কোথাও চাকরি করতে পারেন নি।কেন পারেননি সে প্রশ্ন করলেই বুঝতে পারবেন।
ঢাবির শিক্ষকদের প্রতি সলিমুল্লাহ খান এর প্রচণ্ড হিংসাত্মক বিদ্বেষমূলক আচরণ বিভিন্ন টকশোতে স্পষ্টতই দেখা যায়।
সলিমুল্লাহ খানের যে বইগুলি বাজারে আছে, তা বেশীরভাগই তার সম্পাদনায়, বা অনুবাদ কাজ।তিনি খুব একটা সৃজনশীল লেখক নয়,অরিজিন্যাল/ সৃষ্টিশীল কাজ যারা করে, অর্থাৎ ফিকশান রাইটার শ্রেণীর প্রতি তার মধ্যে একটা চাপা ক্ষোভ কাজ করে। সৃজনশীলতা আল্লাহর দান । সবাই তা পায় না।
তিনি মাতৃভাষা নিয়ে বেশ হৈ হল্লুর করেন প্রশ্ন তুলেন-, কেন মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা দানের ব্যাপারে আমাদের পলিসি মেকিং লেভেলে এত অনীহা?
কেন ক্লাসরুম গুলিতে শিক্ষকদের বাধ্যতামূলকভাবে ইংরেজিতেই কথা বলা লাগে? কেন বেশীরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইংরেজিতে? কেন দোকানপাট, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ইংরেজিকরন করা হচ্ছে? কোণো এক জায়গায় তিনি একটু উত্তেজিত হয়ে বলে বসলেন – যারা বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে নাম রাখে, তারা শুয়োরের বাচ্চা।
অথচ তিনি কত বড় হিপোক্রেট দেখেন – ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি একটি লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদনার সাথে জড়িত ছিলেন, যেখানে খুব সিরিয়াস ধরনের তাত্ত্বিক সামাজিক আলোচনাগুলি হত। সলিমুল্লাহ খান বেশ গর্ব করে বললেন – সে পত্রিকার নাম ছিল “প্রাক্সিস জার্নাল”।
গ্রেশিয়ান ফিলসফি থেকে ‘প্রাক্সিস’ আর ইংরেজী থেকে ধার করা ‘জার্নাল’ নাম দিয়ে “প্রাক্সিস জার্নাল”।
ইংরেজী নামের ব্যবহারের বিষয়ে সলিমুল্লাহ খান গালির তোড়ে যেভাবে শুয়োরের বাচ্চা বলেছিলেন সেই উত্তর ফিরিয়ে দিয়ে তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় ছাত্রজীবনে লিটল ম্যাগের নাম ‘প্রাক্সিস জার্নাল’ রাখার ফলে তার কী নিজেকে বর্তমানে একজন শুয়োরের বাচ্চা মনে হয়?কি জবাব দিবেন তিনি?
মেহেরজান বিতর্কের একটা সিরিজ ভিডিও নিশ্চই আপনারা অনেকেই দেখে থাকবেন,আমিও ইউটিউবে দেখেছিলাম। ফরহাদ মজহার এবং তার ঘনিষ্ঠজনদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সলিমুল্লাহ খান যে সাহসিকতাপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন, যে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখিয়েছিলেন, আমার বেশ ভালোও লেগেছিল। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, অথবা বৃহদার্থে যেকোনো ধরনের জাতীয়তাবাদই যে সর্বাংশে খারাপ নয়, সেটা তিনি ফ্রাঞ্জ ফানোর দা রেচেড অফ দ্য আর্থের রেফারেন্স দিয়ে বুঝিয়ে বলেছিলেন যে – জাতীয়তাবাদ যদি উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার হাতিয়ার হয়, তবে তা অবলম্বন করাই উচিৎ। ‘৭১ এর বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ছিল তেমনই কিছু। তিনি বলেন সিনেমার খাতিরে যদি পাকিস্তানি আর্মির সাথে বাঙ্গালী মেয়ের প্রেম স্বীকার করতে আমাদের অসুবিধা না থাকে তবে কালকে দেশের কোন একটা অঞ্চল যদি স্বাধীনতার ঝাণ্ডা উড়ায়ে দিয়ে বলে আমরা বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনা স্বীকার করি না, তবে তারে অস্বীকার করা যাবে কোন যুক্তিতে।
ড.সলিমুল্লাহ খান প্রচন্ডভাবে রক্ষণশীল মানুষ। আবার পশ্চিমাদের খুশী করার জন্য ড.সলিমুল্লাহ খান সম্প্রতি এক আলোচনায় বলেন যে সমকামিতা এবং (LGBTQ) অধিকার, অপরাধ না। আমাদের আইনে অপরাধ আছে সেটা উনি স্বীকার করেন, কিন্তু উনি মনে করেন আইন পাল্টাতে হবে, যদি না পাল্টাতে চান তাহলে আপনি ফ্যাসিস্ট মতবাদে বিশ্বাস করেন। একদিকে ধর্মের বয়ান করবেন, অন্যদিকে সমকামিতাকে অপরাধ থেকে অব্যাহতি দিবেন,এখানেও তিনি দ্বিচারি মনোভাব দেখিয়েছেন।
আমি মনে করি, বাংলার ষোল কোটি জনগণের দুর্ভাগ্য যে সলিমুল্লাহ সাহেব বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অধিপতি। আমি ব্রাত্যজন। আমার মনে করায় কারো কিছু আসে যায় না। কিন্তু উনি ক্রমাগত সব বিষয়ে সুইপিং কমেন্ট করে করে দু’ চার কলম লিখতে পড়তে পারা বাংলার মানুষজনদের বিচারবুদ্ধির লেভেল নিয়ে ক্রমাগত হাসি ঠাট্টা করে যাচ্ছেন – এটা ওনার দাম্ভিকতা,অহংকার,হিংসাত্মক মন মানসিকতার পরিচয় বহন করে।
আমি কখনো কোনো লেখককে সামারি অ্যাটাকের মাধ্যমে তাচ্ছিল্য করেছি এমনটা মনে পড়েনা।
আমি ড.সলিমুল্লাহ খান এর কাছে একেবারেই অর্বাচীন।আমি তাঁকে পাঠ করি,তিনি যাদের পাঠ করে সমৃদ্ধ হয়েছেন তাদেরও পাঠ করার চেষ্টা করেছি বলেই তার ‘আইডিয়াল ইগো’ তার আত্ম অহংকার ও দাম্ভিকতাকে চুরমার করার তাগিদ থেকেই আমাকে লিখতে হয়েছে।
ড.সলিমুল্লাহ খান এর প্রতি আমার পরামর্শ হচ্ছে- আপনি যাদের দেখতে পারেন না, যাদের দেখলে ঈর্ষায় আপনার শরীর রি রি করে, তাদের প্রতি আর একটু সহনশীল আচরণ করুন। জিহ্বাকে আরও একটু সংযত করুন, সন্মানজনক ব্যবহার করুন।তবেই আপনি যা বলি তার সবই মানুষ গিলবে, বলার মত একটা প্ল্যাটফর্ম পেয়ে গেলেই যা খুশী তাই বলে বেড়ানোটা ভদ্রজনচিত আচরণ নয়।



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।