বাড়িতে ঢোকার পথেই ভেতরে কান্না-আহাজারির আওয়াজ ভেসে আসছিল। ঘরে লোকজনের ভিড়; বাড়িতে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে ঘর ঘেঁষে ১১ হাজার ভোন্টের ঝুঁকিপূর্ণ তারের খুঁটি। গত ৭ বছর ধরে খুঁটি সরানো ও ঝুঁকিপূর্ণ কভারবিহীন তারের ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ঘুরেও কোন প্রতিকার পাইনি পরিবারটি।
গত রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বাড়ির ছাদের কাপড় আনতে গিয়ে ১১ হাজার ভোল্টের কভারবিহীন তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই সন্তানের জননীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো গ্রামটি শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে। এ ঘটনাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না কেউ। উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ভিগরোল এলাকার মাষ্টার আশরাফ আলীর বাড়িতে এঘটনা ঘটে। তাদের সংসারে তিন বছরের এক ছেলে এবং ৬ মাসের এক শিশু সন্তান রয়েছে।
আহাজারি করতে করতে নিহত ২৫ বছর বয়সী গৃহবধু আসমা আকতারের স্বামী মোহাম্মদ তারেক বলছিলেন, ‘আমার সব শ্যাষ অই গেইয়ি, অবুজ বাচ্চারা মা-ডাহিবু কারে’। বাচ্চা দুটিকে বুকে চেপে তারেক ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘এতটুক বাচ্চা লইয়্যা এহন হনডে যাইয়ূম বিচার চাইবু লার’ পল্লী বিদ্যুৎতের অবহেলার কারণে আমার সংসারটা শেষ হয়ে গেল। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবী জানাচ্ছি। যারা দায়িত্বে অবহেলা করেছে তাদের বিচারও চাই।
শুধু নিহত আসমা আক্তারের শ্বশুর বাড়িতে নয়, উপজেলার কালাবিবি দীঘির মোড় এলাকার একাধিক ভবনসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ভবনের ছাদ, টিনশেডের চালা অথবা বিভিন্ন সড়কের পাশে ঝুলে রয়েছে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের লাইন। এসব লাইনের অধিকাংশই স্থানীয়দের নাগালের মধ্যে, যার সংস্পর্শে যে কোনো মুহূর্তে যে কারও প্রাণনাশের আশঙ্কা প্রবল।

যথাযথভাবে দেখভাল না করা এবং সঞ্চালন দেওয়ার সময় লাইনের তার ঝুঁকিমুক্তভাবে স্থাপন না করায় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। রীতিমতো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন বিভিন্ন এলাকার শতাধিক স্থানে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ঝুলন্ত সঞ্চালন লাইন রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা কখনোই এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেন না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ করার পরেও এসব বিদ্যুৎ লাইন নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের কার্যকর কোনো উদ্যোগও নেন না তারা। সঞ্চালন দেওয়ার সময়ই এসব লাইনের বেশির ভাগই অপরিকল্পিতভাবে টানানো হয়। কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তালিকা তৈরির (ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের) তোড়জোড় চলে। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বন্ধ হয়ে যায় এ কার্যক্রম।
গ্রাহকদের কয়েকজন জানান, ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের বিষয়ে অফিসে জানালে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়। কোনো ব্যাপারে অভিযোগ করলে উল্টো গ্রাহকদের ভোগান্তি দেন তারা। কর্মরত কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা একটি দালাল চক্র গ্রাহক হয়রানিতে জড়িত।
নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, গত ৭ বছর ধরে অভিযোগ জানিয়ে আসছি সংযোগটি সরানোর জন্য। এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মরতরা দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। এরপর আর কোনো প্রতিকার মেলেনি।
নিহতের শ^শুর মাষ্টার আশরাফ আলী বলেন, ২০১৮ সালে প্রথমবার লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে। এরপর তো একাধিবার জানিয়েছি, কোনোদিন কেউ এসে পর্যন্ত দেখেনি। ৭ বছর পেরিয়ে গেলো, ঝুঁকিপূর্ণ তার সরানো হয়নি। এ তারের কারণে আজ এঘটনা। দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের স্পষ্ট অবহেলার কারণে এ দুর্ঘটনা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মো. মোরশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জানামতে পরিবারটি ২০২৩ সালের দিকে একটি আবেদন করেন খুঁটি সরানোর জন্য। নিয়মনীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ একটি ডিমান্ড করেন, সে হিসেবে তারা ডিমান্ড পূরণ করেননি। এরপর থেকে তারা ঝুঁকি নিয়ে বাস করছিল।’ তিনি বলেন, এছাড়াও তাদের কভারবিহীন তার কভার লাগানোর জন্য একটি আবেদনও করার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা সেটাও করেননি। আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।