পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতরী গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে রূপ লাভ করে। ইউনিয়নটি উপজেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তবে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি প্রায় ৬৫ বছরেও। এছাড়া সাধারণ মানুষ পাইনি একটি ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী ভবন।
৬ষ্ঠ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জয়ী হন আফতাব উদ্দিন চৌধুরী সোহেল। তিনিও ঝুঁকি নিয়ে পরিষদের বসে দিচ্ছেন সেবা। বর্তমানে ভবনটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের স্থানীয় পর্যায়ে অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা হলেও নজর নেই কারো।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিনই সেবা দিয়ে আসছে পরিষদের চেয়ারম্যান, সচিব ও সদস্যরা। সেবা নিতে আসা শত শত মানুষ আতঙ্কে থাকেন যে, কখন যেন মাথার ওপর ভেঙে পড়ে ভবনের বিভিন্ন অংশ।
জানা যায়, চাতরী ইউনিয়নের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৫৭ সালে প্রয়াত মৌলভী ফজলুল করিম চৌধুরী। তারপরই আবদুর শুক্কুর। ‘৭৭ থেকে ৮৪’- শামসুদ্দিন চৌধুরী। পরের বার আবারও তিনি ও এয়াকুব আলী চৌধুরী। ৯৭ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত টানা ১০ বছর ছিলেন শামসুদ্দিন চৌধুরী। এরপর আবারও বসেন এয়াকুব আলী এবং ২০১১ সালে পর পর দুইবার নির্বাচিত হয়ে টানা ১০ বছর পরিষদ করেন ইয়াছিন হিরু।
পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, পরিষদের জন্মলগ্ন থেকে এ পরিষদের কার্যক্রম চলছে। দীর্ঘদিন ধরে এই ভবনের কোন সংস্কার কিংবা মেরামত না করার কারণে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই ভবনের ছাদ থেকে পলেস্তার খুলে পড়ছে। খুলে পড়ছে পোকায় নষ্ট হওয়া দরজা-জানালাসহ অন্যান্য উপকরণগুলো। জানালার গ্রিলগুলো মরিচায় নষ্ট হয়ে গেছে। পরিষদের গ্রাম আদালত কক্ষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে বর্তমানে এজলাস কক্ষে পরিষদের সকল প্রকারের বিচারকার্য পরিচালনা করাও যায়নি কোনো চেয়ারম্যানের আমলে।
সোমবার (২১ মার্চ) সকালে পরিষদে গিয়ে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে যানা গেছে, পরিষদের চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকার কারণে পরিষদের অনেক মূল্যবান জিনিস রাতের আঁধারে চুরিও হয়ে গেছে বিগত দিন গুলোতে। অনেক সময় পরিষদে সেবা নিতে আসা বিভিন্ন মানুষের মাথায় ছাদের পলেস্তার খুলে পড়ে একাধিকবার ঘটেছে দুর্ঘটনার। তবুও জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়তই সেবা দিয়ে আসছে সংশ্লিষ্টরা। এছাড়াও পরিষদের জায়গাও একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখল রেখে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
অবৈধ দখলদারের কারণে জমি নিধারণ করে মডেল ইউনিয়ন পরিষদ নির্মাণ করতে পারেনি বলে স্থানীয়রা জানায়। ফলে দিনদিন পরিষদের জায়গাও যাচ্ছে প্রভাবশালীদের দখলে। বর্তমানে চেয়ারম্যান অর্থয়ানে ভাড়ায় নিয়ে সেবাগ্রহীতাদের সেবা দিচ্ছেন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. এরফান আলী বলেন, ‘পরিষদে কোন সেবা নিতে আসলে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয় সেবা গ্রহীতাদের। তাই সেবা নেওয়া সময় পর্যন্ত পরিষদের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বর্তমান সরকারের সবকিছুতে আধুনিকতা ও ডিজিটাল উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও এমন জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এখন পর্যন্ত উন্নয়নের কোন ছোঁয়াই স্পর্শ করেনি। এটি ইউনিয়নবাসীদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে ও শহরের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার আগে এই ইউনিয়ন পরিষদকে আধুনিকায়ন করা অত্যন্ত জরুরি এবং সময়ের দাবি।
পরিষদের চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী সোহেল বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর নিজ উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ পুরো ভবনের মধ্যে বসার ঘরটি কোনভাবে সংস্কার করেছি। পরিষদের পুরো ভবনগুলো সংস্কার করার মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দেওয়া পরিষদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সেবা দেওয়া জরুরি বলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা প্রতিদিনই চেষ্টা করছি পরিষদে আসা মানুষদের মানসম্মত সেবা দিতে। পরিষদ ভবনের এমন জরাজীর্ণ অবস্থা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জোবায়ের আহমেদ বলেন, আনোয়ারা উপজেলার ১১ ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ভবন নেই। ইতোমধ্যে আমরা পরিষদের নতুন ভবনের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি। সে গুলোর মধ্যে বারশত, আনোয়ারা সদর ও বটতলী ইউনিয়ন পরিষদে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য অনুমোদন হয়েছে।
তিনি আরো জানান, চাতরী, বারখাইন, বরুমচড়া ও রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের জমির জটিলতার কারণে পিছিয়ে গেছে। এ গুলোর জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গুলোর দ্রুত সংস্কার কিংবা নতুন করে ভবন নির্মাণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানোনো হয়েছে। এখন টেন্ডারের অপেক্ষায় আছে। আশা করছি শীঘ্রই এ গুলোর কাজ শুরু হবে।
এমএফ


