এক দুর্ঘটনায় বিধবা শাশুড়ি-পুত্রবধূ, নিভে গেলো স্বপ্ন

0

“আমার ছেলেডারে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু তা আর পূরণ হইলো না। সড়ক দুর্ঘটনায় সংসারের প্রধান কর্তাসহ সবই কেড়ে নিয়েছে। সৃষ্টিকর্তায় জানেন আমাদের কী হবে।”

গতকাল মঙ্গলবার সকালে অবসরপ্রাপ্ত পিতা দুর্গাপদ মল্লিক (৭০) সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেল যোগে গ্রামের বাড়িতে আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পুত্র স্কুলশিক্ষক বিধান মল্লিকের (৪৭) স্ত্রী তিন্নি সেন (৩৫) স্বামী ও শ্বশুরের মরদেহ পাশে বসে কান্নাজড়িত কন্ঠে এসব কথা বলছিলেন।

তিনি বলেন, আমার ছেলে বিক্রম মল্লিকে তার বাবা-দাদার ইচ্ছা ছিল খ্যাতিমান এক চিকিৎসক বানাবেন। প্রায় বলতেন, ছেলেডারে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়াব, খ্যাতিমান ডাক্তার বানাবো। তাদের এই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল! ডাক্তার বানানোর আগেই দুইজনইকে সৃষ্টিকর্তা নিয়ে গেল। আমাদের এখন কি হবে সৃষ্টিকর্তায় জানেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিকেল পাঁচটায় নিহত পিতা-পুত্রের লাশ বাড়িতে আনার পরই স্বজন ও স্থানীয়রা দেখতে ভিড় করেন চট্টগ্রামের আনোয়ারার চাতরী ইউনিয়নে সিংহরা এলাকার স্কুল শিক্ষক বিধান মল্লিকের বাড়িতে। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই সদস্যের মৃত্যুতে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে পরিবেশ। নিহতের বাড়িতে হৃদয়বিদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পুরো এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসছে।

নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ছুটে আসছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। নিহত বিধানের চার বছরের পুত্র সন্তান বিক্রম মল্লিক, ৮ বছরের মেয়ে মিতা মল্লিক ও ১২ বছরের দীপান্বিতা মল্লিক দাদা ও বাবার মরদেহের পাশে বসে রয়েছে। বিধানের মা বৃদ্ধা স্বপ্না মল্লিক (৭০) স্বামী ও পুত্রকে হারিয়ে অজ্ঞান প্রায়। যেন এক দুর্ঘটনায় বিধবা হলেন শাশুড়ি ও পুত্রবধূ। রাতে নিজগ্রামে ধর্মীয়রীতি অনুযায়ী তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে পরিবার।

নিহতের ভাতিজা নিউটন সরকার বলেন, আমার কাকা ও কাকাতো ভাই পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটা এলাকায় একটি ভাড়াবাসায় থাকেন। প্রায় সময়ে গ্রামে আসতেন। কাকা দুর্গাপদ মল্লিক সানোয়ারা গ্রুপে চাকরি করতেন। সম্প্রতি অবসরে এসে ঘরে নাতী-নাতনীদের নিয়ে সময় কাটাতেন। সংসারের হাল ধরা দুইজন কর্তাকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবার। বিধানের অবুজ ছেলেটা এখনও জানে না তার দাদা ও বাবা বেঁচে নেই। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।

স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহত বিধান মল্লিকের সহপাঠী মো. শহীদুল আলম বলেন, বিধান খুবই শান্ত স্বভাবের ছিল। স্কুলে ও ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনোর দিকে নজর ছিল তার বেশি। ঝড় তুফান যাই হোক স্কুল বা টিউশন কখনও বাদ যেত না। একই দিনে পরিবারের দুইজন মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।

এর আগে, মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল আটটায় কর্ণফুলীর নতুন ব্রিজ এলাকায় পিক-আপের ধাক্কায় নিহত হন পিতা দুর্গাপদ মল্লিক (৭০) ও তার পুত্র বিধান মল্লিক (৪৭)। দুইজনই মোটরসাইকেল যোগে আনোয়ারার সিংহরা বাড়িতে আসছিলেন। বিধান মল্লিক কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনূর আলম বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই ঘাতক পিকআপ ভ্যানটি জব্দ করা হয়েছে। চালক পালিয়ে গেলেও তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে। এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে পরিবার।

চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর তালুকদার জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দুটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।