দেশের কৃষিজমি দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষিজমি সংরক্ষণ, ভূমির জোনভিত্তিক পরিকল্পনা এবং পাহাড়-টিলা, বন ও জলাশয়ের সুরক্ষায় ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে সরকার। খসড়া অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কোনো কৃষিজমি অকৃষিকাজে ব্যবহার বা সেখানে বাণিজ্যিক আবাসন, রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা কারখানা নির্মাণ করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পর এটি কার্যকর হবে। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পকারখানা সম্প্রসারণের কারণে দেশে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়েছে। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি বাদ দিয়ে সারা দেশে এই অধ্যাদেশ কার্যকর হবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী সরকার অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সারাদেশে ‘ভূমি ব্যবহার জোনিং ম্যাপ’ তৈরি করবে এবং এতে ভূমিকে ১৮ শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। কৃষি, বিশেষ কৃষি, মৎস্যচাষ, বন, জলাশয়, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, পরিবহন, পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা, সাংস্কৃতিক-ঐতিহ্যসহ প্রতিটি ভূমি আলাদা জোনিংয়ের আওতায় থাকবে। জোনিং চূড়ান্ত হওয়ার আগেই জেলা প্রশাসকদের কৃষিজমি, জলাধার, বনভূমি, পাহাড়-টিলা ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকার তালিকা প্রস্তুত করে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।
খসড়ায় বিশেষ কৃষি অঞ্চল ঘোষণার বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে দুই বা ততোধিক মৌসুমি ফসল উৎপাদিত হয়। এসব অঞ্চলের জমি কোনোভাবেই অকৃষিকাজে ব্যবহার করা যাবে না। ব্যতিক্রম হিসেবে জাতীয় প্রয়োজনে ন্যূনতম পরিমাণ জমি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে, তবে মোট কৃষিজমির ১০ শতাংশের বেশি নয় এবং ইতোমধ্যে অধিগ্রহণ করা অব্যবহৃত জমি আগে ব্যবহার করতে হবে।
কোনো ব্যক্তি নিজের কৃষিজমিতে সীমিত পরিসরে বসতবাড়ি, উপাসনালয়, পারিবারিক পুকুর বা কুটির শিল্প স্থাপন করতে পারবেন, তবে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ করলে তা অপসারণযোগ্য হবে। কৃষিভূমির শ্রেণি পরিবর্তন বা জোনিং বহির্ভূত কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
অধ্যাদেশের ১৪ ধারায় শাস্তির বিধান বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া কৃষিজমি অকৃষিকাজে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা, বাণিজ্যিক আবাসন বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলে দুই বছর কারাদণ্ড বা চার লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। বিশেষ কৃষি অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত করলে তিন বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। জলাভূমি, পাহাড়-টিলা বা বনের ক্ষতি করলে আইনে নির্ধারিত শাস্তির পাশাপাশি মাটি অপসারণ, পরিবেশ পুনর্বহাল ও বৃক্ষরোপণের মতো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বলেন, কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে কৃষিজমির দ্রুত হ্রাস খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই কৃষিজমি, বন, পাহাড়, জলাশয়সহ পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জমি রক্ষায় এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। অনুমোদন পেলে এটি দ্রুত কার্যকর করা হবে।



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।