একটি ভালো বই বদলে দিতে পারে মানুষের চিন্তার জগৎ, খুলে দিতে পারে নতুন পৃথিবীর দরজা। বইয়ের পাতায় পাতায় খুঁজে পাওয়া যায় জীবনকে দেখার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশ্ন করার সাহস আর মুক্তচিন্তার প্রেরণা। অথচ ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারে যখন তরুণদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ, তখন রাঙামাটি সরকারি কলেজে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে ‘পাহাড়িয়া পাঠচক্র’। বই পড়া, আলোচনা, কবিতা, গান আর মুক্তচিন্তার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই পাঠচক্র হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও মনন বিকাশের এক প্রাণবন্ত মঞ্চ।
কলেজের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মহিবুর রহমান নুহুর উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই পাঠচক্রের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি, জ্ঞানচর্চায় আগ্রহ বাড়ানো এবং মানবিক ও নান্দনিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো। এখানে বই পড়া মানে শুধু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শেষ করা নয়; বরং পড়া বই নিয়ে ভাবা, নিজের উপলব্ধি প্রকাশ করা, অন্যের মতামত শোনা এবং যুক্তি দিয়ে নিজের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করা।
বই থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণায় পাঠচক্র
মো. মহিবুর রহমান নুহুর কাছে বই কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; জীবনকে নতুনভাবে চিনতে শেখারও সঙ্গী। জীবনে তাঁর অর্জন ও চিন্তার বিকাশে বইয়ের অবদানকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। বই তাঁকে দিয়েছে জ্ঞানের বিস্তার, চিন্তার গভীরতা এবং জীবনকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দীর্ঘদিন ধরে বইকে কেন্দ্র করে কিছু করার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও দৃঢ় হয়।
তিনি উপলব্ধি করেন, শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা সীমাবদ্ধ থাকলে তাদের চিন্তার জগৎ পূর্ণতা পাবে না। বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত গ্রন্থ, দর্শন, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ নানা বিষয়ের বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেলে শিক্ষার্থীদের চিন্তা, মনন ও সৃজনশীলতা আরও বিকশিত হবে।
সেই ভাবনা থেকেই শিক্ষার্থীদের নিয়ে সপ্তাহে এক দিন বই পড়া, বই নিয়ে আলোচনা এবং প্রাণবন্ত আড্ডার আয়োজন করার পরিকল্পনা করেন তিনি। দীর্ঘদিনের ভাবনা ও পরিকল্পনার বাস্তব রূপ পায় ২০২৬ সালের ২৫ জুলাই। ওই দিন রাঙামাটি সরকারি কলেজে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘পাহাড়িয়া পাঠচক্র’।
এরপর শুরু হয় সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম। অল্প সময়ের মধ্যেই কলেজের বিভিন্ন বিভাগের ৩০ জন শিক্ষার্থী এতে যুক্ত হন। তাঁদের অংশগ্রহণে শুরু হয় পাঠচক্রের নিয়মিত কার্যক্রম। বইকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের এই সম্মিলিত পথচলা ক্রমেই ধারণ করছে জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের নতুন সম্ভাবনা।
বই পড়ার সঙ্গে গান, কবিতা ও ভাবনার মেলবন্ধন
গতানুগতিক পাঠচক্রের ধারণার বাইরে গিয়ে ‘পাহাড়িয়া পাঠচক্র’-কে প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময় করে তোলার চেষ্টা করছেন এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রতি সপ্তাহে নির্বাচিত একটি বইকে কেন্দ্র করে বসে পাঠচক্রের আসর। সেখানে শিক্ষার্থীরা বইটির বিষয়বস্তু, বক্তব্য ও তা থেকে পাওয়া উপলব্ধি নিয়ে আলোচনা করেন। তুলে ধরেন নিজেদের পাঠ-প্রতিক্রিয়া, প্রশ্ন ও মতামত।
তবে আয়োজনটি কেবল বইয়ের আলোচনা বা সাহিত্যবিষয়ক কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ নয়। পাঠচক্রের আসরে থাকে গান, কবিতা আবৃত্তি, স্বরচিত কবিতা পাঠসহ নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ফলে শিক্ষার্থীরা বই নিয়ে নিজেদের ভাবনা প্রকাশের পাশাপাশি সুপ্ত প্রতিভা বিকাশেরও সুযোগ পান।
কোনো কোনো বইয়ের আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা বিশেষজ্ঞকে। তিনি বইটির বিষয়বস্তু, দর্শন, সাহিত্যিক মূল্য ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীরাও প্রশ্ন করার এবং নিজেদের কৌতূহল মেটানোর সুযোগ পান।
এভাবে বইকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে প্রশ্ন, যুক্তি, মতবিনিময় ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ। এখানে শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের বক্তব্য জানছেন না, বরং সেই বক্তব্যকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও চিন্তার আলোকে বিশ্লেষণ করতেও শিখছেন। শিক্ষার এই চর্চা তাঁদের পাঠাভ্যাসের পাশাপাশি মননশীলতা ও মতপ্রকাশের সক্ষমতা বিকাশেও সহায়ক হতে পারে।
শ্রেণিকক্ষের বাইরে সমাজ ও প্রকৃতিকে চেনা
‘পাহাড়িয়া পাঠচক্র’-এর কার্যক্রম বই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বোধ বিকাশে বিভিন্ন কর্মশালা, জাতীয় দিবস উদযাপন এবং রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী পালনের মতো উদ্যোগও রয়েছে সংগঠনটির।
এর অন্যতম ব্যতিক্রমী আয়োজন ‘প্রতিবেশ অধ্যয়ন’। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ ও বইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেদের চারপাশের মানুষ, সমাজ, প্রকৃতি ও পরিবেশকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তৈরি করা হয়।
বইয়ে পড়া ধারণার সঙ্গে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার যোগসূত্র তৈরি করা এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সমাজের মানুষ, পরিবেশের পরিবর্তন, স্থানীয় জীবনযাপন ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চারপাশ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে পারেন। এতে শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রস্তুতি না হয়ে জীবন ও সমাজকে বোঝার মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়।

বই নির্বাচনে গুরুত্ব চিন্তা ও মননের বিকাশ
একটি পাঠচক্রের প্রাণ তার বই। তাই ‘পাহাড়িয়া পাঠচক্রে’ বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতি সপ্তাহে কোন বইটি পড়া হবে, তা নির্ধারণের সময় বইটির সাহিত্যিক ও নান্দনিক মূল্য, জ্ঞানগত গুরুত্ব, চিন্তার গভীরতা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সম্ভাব্য ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এমন বই নির্বাচনের লক্ষ্য শুধু শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন লেখকের সঙ্গে পরিচিত করানো নয়; বরং তাঁদের ভাবতে শেখানো, প্রশ্নের মুখোমুখি করা এবং পরিচিত বিষয়কে নতুন চোখে দেখতে উৎসাহিত করা। একটি ভালো বই পাঠকের সামনে যেমন নতুন তথ্য তুলে ধরে, তেমনি তার প্রচলিত ধারণা ও চিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়েও ভাবতে শেখায়।
এই চর্চার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সহনশীলতা ও ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়।
মানবিক ও মুক্তচিন্তার সমাজ গড়ার স্বপ্ন
‘পাহাড়িয়া পাঠচক্র’-এর প্রতিষ্ঠাতা মো. মহিবুর রহমান নুহু বলেন, “উন্নত, কল্যাণকর, নান্দনিক ও উদার চিন্তা-চেতনাসমৃদ্ধ মানুষের সমাজ বিনির্মাণে বই পাঠের কোনো বিকল্প নেই। আমরা বিশ্বাস করি, একটি ভালো বই একজন মানুষের চিন্তার জগৎ বদলে দিতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই ‘পাহাড়িয়া পাঠচক্র’-এর যাত্রা। এই পাঠচক্রের মাধ্যমে মানবিক, যুক্তিবাদী, নান্দনিক ও মুক্তচিন্তার মানুষ গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যেতে চাই।”
তাঁর এই প্রত্যাশার সঙ্গে মিশে আছে শিক্ষাকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের চিন্তা, বিবেক ও মূল্যবোধের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা। কারণ, জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সেই জ্ঞানকে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর মানসিকতা তৈরি করাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
রাঙামাটি সরকারি কলেজের ‘পাহাড়িয়া পাঠচক্র’ সেই লক্ষ্যেই ছোট পরিসরে একটি উদ্যোগের সূচনা করেছে। ৩০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরু হওয়া এই আয়োজনের সামনে এখন নিয়মিত পাঠচর্চা ধরে রাখা, আরও শিক্ষার্থীকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং জ্ঞান ও সংস্কৃতির পরিসর বিস্তৃত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
একটি বই থেকে শুরু হতে পারে একটি নতুন ভাবনা; একটি আলোচনা খুলে দিতে পারে চিন্তার নতুন দুয়ার। আর এমন অসংখ্য ভাবনা ও আলোচনার সম্মিলনেই গড়ে উঠতে পারে মননশীল, মানবিক ও মুক্তচিন্তার সমাজ। রাঙামাটি সরকারি কলেজের ‘পাহাড়িয়া পাঠচক্র’ সেই সম্ভাবনারই এক আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।


