একজন মানুষ যখন হাসপাতাল বেছে নেন, তখন তিনি আসলে শুধু একটি হাসপাতালের নাম বেছে নেন না। তিনি নিজের কিংবা পরিবারের একজন সদস্যের চিকিৎসার জন্য কোথায় আস্থা রাখবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেন। আর এখানেই স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্র্যান্ডিং অন্য অনেক খাতের ব্র্যান্ডিং থেকে আলাদা।
আমার কাজের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, একটি হাসপাতালের ব্র্যান্ড শুধু বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৈরি হয় না। একটি ভালো প্রচারণা মানুষকে হাসপাতাল সম্পর্কে জানাতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন রোগীকে সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রাখে তার অভিজ্ঞতা।
একজন রোগী হয়তো প্রথমে অনলাইনে একজন চিকিৎসককে খুঁজলেন। এরপর হাসপাতালের ওয়েবসাইট দেখলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গেলেন, ফোন করে কিছু জানলেন। তারপর চিকিৎসার সময় নির্ধারণ করে হাসপাতালে এলেন। রোগীর কাছে এগুলো আলাদা আলাদা যোগাযোগ নয়। সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একটি সামগ্রিক ব্র্যান্ড অভিজ্ঞতা।
তাই আমার কাছে একটি প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ—আমরা যা বলছি, রোগী কি বাস্তবে সেটিই অনুভব করছেন?
যদি বিজ্ঞাপনে আমরা বলি সেবা সহজ, কিন্তু চিকিৎসার সময় নির্ধারণ করাই কঠিন হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি ও রোগীর অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়। আমরা যদি চিকিৎসকদের দক্ষতার কথা বলি, কিন্তু অনলাইনে সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য না থাকে, সেখানেও মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্র্যান্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই।
একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম কোনো একটি বড় প্রচারণা কিংবা গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর দিয়ে তৈরি হয় না। সুনাম তৈরি হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। একজন রোগী ফোন করলে তাঁর সঙ্গে কীভাবে কথা বলা হলো, তিনি সঠিক তথ্য পেলেন কি না, চিকিৎসার সময় নির্ধারণ কতটা সহজ ছিল, চিকিৎসক সম্পর্কে অনলাইনে তথ্য কতটা পরিষ্কার—এসব বিষয় হয়তো আলাদা করে খুব বড় মনে হয় না। কিন্তু রোগীর কাছে এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে, একটি ভুল তথ্য বা অসম্পূর্ণ যোগাযোগও মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগের কাজ আমার কাছে শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তৈরি কিংবা গণমাধ্যমে প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় একটি অংশ হলো প্রতিষ্ঠানের সুনাম তৈরি করা এবং সেই সুনাম ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখা।
ডিজিটাল মাধ্যম এখন হাসপাতালের সঙ্গে রোগীর যোগাযোগের প্রথম দরজাগুলোর একটি। আগে একজন মানুষ হয়তো সরাসরি হাসপাতালে যেতেন কিংবা পরিচিত কারও পরামর্শ নিতেন। এখন সেই যাত্রা অনেক আগেই শুরু হয়।
একজন রোগী হয়তো রাতে বাসায় বসে কোনো উপসর্গ নিয়ে অনলাইনে খুঁজছেন। কোনো চিকিৎসকের যোগ্যতা দেখছেন। হাসপাতালের ওয়েবসাইটে চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে পড়ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য দেখছেন। এরপর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কোথায় যোগাযোগ করবেন।
অর্থাৎ, রোগী হাসপাতালে আসার আগেই হাসপাতালের সঙ্গে তাঁর একটি সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাচ্ছে।
এ কারণে ডিজিটাল বিপণনকে শুধু বিজ্ঞাপনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের ডিজিটাল বিষয়বস্তুর উদ্দেশ্য শুধু মানুষের কাছে পৌঁছানো কিংবা প্রতিক্রিয়া বাড়ানো হওয়া উচিত নয়। একজন মানুষ তথ্য দেখে কী বুঝলেন, তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেলেন কি না এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া তাঁর জন্য সহজ হলো কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল মাধ্যমে আমরা অনেক কিছু পরিমাপ করতে পারি। কতজন মানুষ একটি বিষয় দেখলেন, কতজন ওয়েবসাইটে গেলেন, কোথা থেকে জানতে চাওয়া এলো, কতজন চিকিৎসার সময় নির্ধারণের দিকে এগোলেন—এসব তথ্য আমাদের কাছে থাকে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—তথ্য আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু কৌশল নির্ধারণ করে না।
শুধু কতজন দেখেছেন, কতজন ক্লিক করেছেন কিংবা কতজন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তা দিয়ে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রচারণার সাফল্য বিচার করা যায় না। আমাদের জানতে হবে—এই যোগাযোগ কি মানুষকে সঠিক স্বাস্থ্যতথ্য দিয়েছে? চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পথ কি সহজ করেছে? প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কি বাড়িয়েছে? এবং শেষ পর্যন্ত রোগী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থবহ কোনো মূল্য তৈরি করেছে কি না?
এখানেই স্বাস্থ্যসেবা বিপণনের সঙ্গে রোগীর অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রমের যোগসূত্র তৈরি হয়।
তবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে বার্তা দিচ্ছি, তা একজন মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ভয় দেখানো, অতিরঞ্জিত দাবি করা কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া কোনোভাবেই দায়িত্বশীল যোগাযোগ হতে পারে না।
আমার বিশ্বাস, স্বাস্থ্যসেবা যোগাযোগের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে তথ্য দেওয়া, সচেতন করা এবং ক্ষমতায়িত করা। একজন মানুষ যেন সঠিক তথ্য পেয়ে সঠিক সময়ে নিজের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—যোগাযোগের বড় উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সেটিই।
তাহলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবা বিপণন কোন দিকে যাবে?
আমার কাছে এর উত্তর শুধু আরও বেশি ডিজিটাল হওয়া নয়। বরং ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আরও বেশি রোগীকেন্দ্রিক হওয়া।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক যোগাযোগ ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, স্বাস্থ্যসেবার মূল জায়গায় মানুষের প্রয়োজন থেকেই যাবে।
একজন রোগী শুধু তথ্য চান না। তিনি স্পষ্টতা চান। তিনি আশ্বস্ত হতে চান। তিনি চান কেউ তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুক।
তাই আগামী দিনের স্বাস্থ্যসেবা ব্র্যান্ডকে প্রযুক্তি ও মানবিকতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত একটি হাসপাতালের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিজ্ঞাপনের বাজেট নয়। শুধু বড় ভবন নয়। এমনকি শুধু উন্নত প্রযুক্তিও নয়।
সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের আস্থা
এই আস্থা একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিনের কাজের মাধ্যমে এটি তৈরি করতে হয়। প্রতিটি রোগীর সঙ্গে প্রতিটি যোগাযোগের মাধ্যমে সেই আস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হয়।
আমার কাছে স্বাস্থ্যসেবা ব্র্যান্ডিংয়ের মূল কথাটি তাই খুব সহজ—আমরা কী বলছি, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রোগী আমাদের মাধ্যমে কী অনুভব করছেন, সেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি হাসপাতালের ব্র্যান্ড শেষ পর্যন্ত তার নাম নয়, তার প্রতীক নয়, তার প্রচারণাও নয়।
একটি হাসপাতালের প্রকৃত ব্র্যান্ড হলো মানুষের মনে তৈরি হওয়া আস্থা।
লেখক: ডিজিটাল, ব্র্যান্ড ও জনসংযোগ বিভাগের প্রধান
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম


