ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতু বৈচিত্র্যের কারণে পার্বত্যাঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের সমাহার ঘটেছে। ছোট আয়তনের এ অঞ্চলটি বিভিন্ন ধরনের বন্য প্রাণী সম্পদও বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে পার্বত্যাঞ্চলের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বন্য প্রাণী বর্তমানে বিপন্ন। পার্বত্যাঞ্চলের বনভূমি, জলাভূমি বা লোকালয় বিভিন্ন বন্য প্রাণীর উপস্থিতি প্রানবন্ত করে তুলে পাহাড়ের প্রকৃতিকে।
পরিবেশগত দিক থেকেও প্রতিটি বন্য প্রাণীর রয়েছে অপরিসীম অবদান। তবে মানুষের নানামুখী কর্মকান্ডে সংকুচিত হয়েছে বন্য প্রাণীর আবাস্থল ও কমেছে এদের সংখ্যা। কিছু প্রজাতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীতে পরিনত হয়েছে আর কিছু সম্পূর্নরূপে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বন্য প্রাণীর যে প্রজাতিগুলো টিকে আছে সেগুলোও বর্তমানে বিপন্ন। এদের মধ্যে রয়েছে বাঘ, হাতি, শজারু, লজ্জাবতী বানর, হনুমান, উল্লুক, শকুন, লেপার্ট, মাকড়শা, অজগর, শঙ্খিনী, পাখিসহ প্রভৃতি প্রাণী।
অন্যদিকে প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের গবেষণা মতে, বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা ৩১টির মতো। তবে এ সংস্থাটির দাবি, বাংলাদেশে এক হাজার ৬শর বেশি প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে ৩৯০টি একেবারে শেষ হওয়ার পথে।
২০২৪ সালে সবচেয়ে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর মধ্যে অন্যতম আমুর চিতাবাঘ, গণ্ডার, ওরাঙ-ওটান, গরিলা, সাওলা, সুন্দা বাঘ, ইয়াংজি ফিনলেস পোরপোইস, কচ্ছপ এবং হাতি। এছাড়া এ রকম আরও অসংখ্য প্রাণী আছে, যারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, না হয় খুবই স্বল্পসংখ্যক বেঁচে আছে। তেমনই এক বিলুপ্ত প্রাণী সাদা গণ্ডার।
প্রতিনিয়ত আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ার কারণে প্রাণী জগৎ হয়ে পড়ছে কোণঠাসা ও বিপদগ্রস্ত। যা পার্ত্যাঞ্চলের চারণভূমি থেকে বিদায় দিয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, নির্বিচারে বনভূমি উজার হওয়ায় ফলে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক না থাকায় দিনদিন দেশের অন্যান্য স্থানের মতো পাহাড়েও বন্য প্রাণী কমছে। একসময় এ অঞ্চলে বাঘ, হরিণ, চিতা সহ নানা ধরনের বন্য প্রাণী দেখা যেতো। যা এখন বিলুপ্ত।
পরিবেশ ও বন্য প্রাণী রক্ষায় প্রাণীদের আবাসস্থল, প্রজননক্ষেত্র বৃদ্ধি এবং বৃক্ষ নিধন, ক্ষতিকর তামাক চাষ, ইটভাটার কালো ধোঁয়া প্রতিরোধ করতে হবে। এছাড়া শুধু দিবস কেন্দ্রিক সভা-সেমিনার কিংবা ব্যানারের প্রতিপাদ্যে বন্য প্রাণী রক্ষার কথা বললেই হবে না, তা বাস্তবরূপ চায় পার্বত্যবাসী।
প্রকৃতি ও জীবন সংগঠনের সংগঠক সাংবাদিক আরমান খান জানান, জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এ পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করতে বিশ্বে জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য মানুষ হরহামেশাই বন উজাড় করছে। এতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক বন্যপ্রাণীও। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক বন্যপ্রাণী। বর্তমানে যে প্রজাতিগুলো টিকে আছে সেগুলো সংরক্ষণ করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পাশাপাশি পাহাড়ে বসবাসরত স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই রক্ষা পাবে বন ও বন্য প্রাণী।
এবিষয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে বন সৃষ্টি ও বন্য প্রাণী রক্ষায় কাজ করা খাগড়াছড়ির পিটাছড়া বনকর্তা মাহফুজ রাসেল বলেন, পার্বত্যাঞ্চল তথা খাগড়াছড়ি বন্য প্রাণীর জন্য একটা উপযুক্ত জায়গা। ধরা যায় একপ্রকার অভয়ারণ্য-অভয়াশ্রম। কিন্তু বর্তমান সময়ে পাহাড়ে বিভিন্ন চাষাবাদের নামে গাছ কাটা, ছড়া-নদী ভরাট করা, কচু ও কাসাভা চাষ করে টপ সয়েল যেমন নষ্ট করছে ঠিক একইভাবে পরিবেশ নষ্ট করে বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন করছে। বন্য প্রাণী রক্ষায় সকলের এগিয়ে আসা দরকার।
রাঙামাটি জুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. তবিবুর রহমান বলেন, আমরা বন্য প্রাণী রক্ষায় সবসময়ই কাজ করে আসছি। শিকারীদের কবল থেকে বিভিন্ন প্রাণী জব্দ করে বনে অবমুক্ত করছি। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন কেউ লঙ্ঘন করলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। এছাড়া বন ও বন্য প্রাণী রক্ষায় আমরা সর্বদা সোচ্চার রয়েছি।
প্রসঙ্গত, বিপন্ন বন্য প্রাণীদের রক্ষার বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিতে ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ৬৮তম সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর মার্চ মাসের ৩ তারিখে পালিত হয় বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস। এই দিবসের গুরুত্ব উপলব্ধির মাধ্যমে আমাদের সবার সম্মিলিত উদ্যোগ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে পারে। সেই সাথে বাঁচিয়ে রাখতে পারে পার্বত্য অঞ্চলের বন্য প্রাণীগুলোকে।



মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।