একসময় বাংলাদেশে নিউরোলজি (মস্তিষ্ক ও স্নায়ুরোগ) চিকিৎসাসুবিধা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। জটিল স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই উন্নততর চিকিৎসার খোঁজে দেশের বাইরে যেতে হতো। তবে গত এক দশকে উন্নত হাসপাতাল অবকাঠামোর সাথে সুদক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি এবং আধুনিক রোগ নির্ণায়ক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা বাংলাদেশেই অনেক জটিল নিউরোলজিক্যাল রোগনির্ণয় ও তার চিকিৎসা সম্ভব ও সহজ করে তুলেছে।
অন্যান্য দেশগুলোর মতোই বাংলাদেশেও Stroke এক অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস যেমন, খাদ্য প্রস্তুতিতে মাত্রাতিরিক্ত তৈল ও তৈলজাতীয় পদার্থের ব্যবহার, স্থূলতা বা অধিক ওজনের ভারে অচল হতে চলা শরীর, নৈশনিদ্রায় মারাত্মক অনিয়ম, পেশা ও জীবনযাপন পদ্ধতি অারোপিত অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং আরো অনেক – সব মিলিয়ে তুলনামূলকভাবে কম বয়সীদের মধ্যে স্ট্রোক আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন ধরণের বিরল মাথাব্যথা, পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি, মায়োপ্যাথি, নিউরোমাসক্যুলার জাংশন ডিসঅর্ডার, স্লীপ ডিসঅর্ডার, বিভিন্ন বিরল নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ এবং জীনগত স্নায়বিক রোগগুলো নির্ণয় করা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। এধরণের সমস্যাগুলোকে এক সময় শারীরিক দুর্বলতা, ব্যখ্যাঅযোগ্য রোগ বা বার্ধক্যজনিত সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও এখন মানুষ ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছেন এবং দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
নিউরোলজি চিকিৎসায় বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহার নানাভাবে দ্রুত বাড়ছে। আধুনিক নিউরোইমেজিং, নিউরোফিজিওলজি এবং নিউরো-ইন্টারভেনশনাল পদ্ধতির সঠিক ব্যবহার এখন দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়ে সহায়ক হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বর্তমানকালে স্ট্রোক চিকিৎসায় ‘Therapeutic window”, ‘Time is brain’, ‘BE FAST’ ইত্যাদি ধারণাগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোক মস্তিষ্কের কোন অংশে আঘাত করেছে এবং কত দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়েছে তা স্ট্রোকের ক্ষতিকর পরিণতির ক্ষেত্রে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিতে পারে। স্ট্রোকের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া, বাকশক্তি হারিয়ে ফেলা এবং সর্বোপরি মৃত্যুঝুঁকি বা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। একইসঙ্গে মাল্টিডিসিপ্লিন্যারি অ্যাপ্রোচ তথা নিউরোলজিস্টের সমন্বয়ে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ, দক্ষ ফিজিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট, অক্যুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্ট এবং স্পেশালিস্ট নার্সদের সমন্বিত চিকিৎসা সেবায় রোগীরা আগের তুলনায় দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় গত বেশ কয়েক বছরে একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে। রোগীরা ধীরে ধীরে দেশের ভেতরেই বিশেষায়িত চিকিৎসার ওপর আস্থা রাখছেন। রাজধানীর বাইরে বড় শহরগুলোতেও উন্নত নিউরোলজি সেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে রোগীদের জন্য চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য হয়ে উঠছে। এতে শুধু চিকিৎসা ব্যয়ই কমছে না, রোগী ও তাঁর পরিবারের মানসিক চাপও অনেক কমে যাচ্ছে। একইসঙ্গে দেশের চিকিৎসকরাও এখন আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জটিল রোগ ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষ হয়ে উঠছেন।
এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম। হাসপাতালটির নিউরোলজি বিভাগে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও তদারকি, বিশ্বমানের ডায়াগনোস্টিক সুবিধা এবং সুসমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। স্ট্রোক, এপিলেপসি, হেডেক, পারকিনসন্স ডিজিজ, স্নায়বিক ব্যথা এবং বিভিন্ন জটিল নিউরোলজিক্যাল রোগের চিকিৎসায় হাসপাতালটি সমন্বিত সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। পাশাপাশি উন্নত আইসিইউ সুবিধা, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা এবং মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমের সমন্বয় জটিল রোগীদের চিকিৎসাকে কার্যকর ও সফল করে তুলছে। চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলের অনেক রোগি এখন উন্নত নিউরোলজি সেবার জন্য রাজধানী বা দেশের বাইরে না গিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামে চিকিৎসা গ্রহণে স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বস্তি বোধ করছেন।
আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে নিউরোলজি চিকিৎসা আরও বিস্তৃত হবে। দীর্ঘ প্রশিক্ষণে দক্ষ বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি, প্রযুক্তিনির্ভর রোগ নির্ণায়ক ব্যবস্থার প্রায়োগিক উৎকর্ষ এবং রোগ দ্রুত শনাক্তকরণের সক্ষমতায় অগ্রগতির ফলে স্নায়ুরোগ চিকিৎসায় দেশ উত্তরোত্তর এগিয়ে চলেছে।
লেখক
ডা. মোহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম চৌধুরী
অ্যাটেন্ডিং কনসালটেন্ট, নিউরোলজি বিভাগ
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম


