‘ছয় মাসেই বিএনপির জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে’

0

দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর আওয়ামী লীগের ‘জুলুম-নির্যাতনের’ বিরুদ্ধে লড়াই করা বিএনপি ক্ষমতায় এসে একই রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা শুরু করেছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তার দাবি, ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বিএনপির জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে দলীয়করণ, নিয়োগ-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকেলে খাগড়াছড়ির একটি কমিউনিটি সেন্টারে এনসিপির সাংগঠনিক সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন সারজিস আলম।

বিএনপির সমালোচনা করে সারজিস আলম বলেন, দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর দলটির নেতাকর্মীরা মিথ্যা মামলা, গুম, খুন ও রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের আমলে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে তারা নির্যাতিত হয়েছেন, এখন বিএনপিও সেই একই ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি চর্চা শুরু করেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির সঙ্গে বিদ্যুৎ, কৃষি, উৎপাদন ও পরিবহনসহ দেশের প্রায় সব খাত সরাসরি যুক্ত। ফলে এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। তার অভিযোগ, মানুষ টাকা দিয়েও সার পাচ্ছেন না, মূল্য পরিশোধ করেও বিদ্যুৎ-গ্যাস পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বিএনপির এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে সারজিস বলেন, ছয় মাসে সেই লক্ষ্যের কাছাকাছিও যেতে পারেনি সরকার। বরং অনেক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। তার দাবি, এই সময়ে একটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে—চাঁদাবাজির। কয়েক লাখ মানুষের পেশা চাঁদাবাজিতে পরিণত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

দেশের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন সারজিস। তার ভাষায়, সর্বত্র স্বজনপ্রীতি চলছে। যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট বন্ধ করতে যাওয়া সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের হয়রানি, গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

নারী ইউএনওদের হেনস্তা এবং সিলেটের ডিসি সারোয়ার আলমকে বদলির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইউএনও কার্যালয়ে গিয়ে নারী ইউএনওদের বিএনপির নেতাকর্মীদের হেনস্তার ঘটনা মানুষ দেখেছে। সিলেটের ডিসি সারোয়ার আলম চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট বন্ধ করতে উদ্যোগী হওয়ায় এক দিনের মধ্যে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

সারজিস বলেন, এভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণের মধ্য দিয়ে বিএনপির মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার আগের রাজনৈতিক ধারায় ফিরে যাচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বিএনপি মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই সেই জায়গায় ফিরে গেছে।

বিএনপিকে সতর্ক করে তিনি বলেন, তারা বিরোধী দল হতে পারেন। বিএনপির ভালো কাজকে ভালো বলার পাশাপাশি যেখানে সমালোচনা প্রয়োজন, সেখানে সমালোচনা করা হবে। সমালোচনা করলে চোখ তুলে নেওয়া কিংবা রক্তাক্ত করার হুমকি দিলেও তাঁরা পিছপা হবেন না। বাংলাদেশের মানুষ বিবেকবোধ হারিয়ে ফেলেনি। যে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেই মানুষ এ ধরনের জুলুম বেশিদিন সহ্য করবে না।

বিএনপিকে দ্রুত ‘হেদায়েতের পথে’ ফিরে এসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করার আহ্বান জানান সারজিস। একই সঙ্গে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিও জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে কোটা প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, পাহাড়ের মানুষ এবং শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য যৌক্তিক মাত্রায় কোটা থাকা প্রয়োজন। কারণ সমতলের তুলনায় পাহাড়ের মানুষ শিক্ষা, চাকরি, বসবাস ও পারিবারিক জীবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশি প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন।

তবে এই কোটা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর দাবি, প্রাপ্য ব্যক্তিকে সুযোগ না দিয়ে একটি সিন্ডিকেট নিয়োগ-বাণিজ্যের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

পার্বত্য জেলা পরিষদ নিয়েও বিএনপির বিরুদ্ধে ‘দলীয় কোটা’ চালুর অভিযোগ করেন সারজিস। তিনি বলেন, বিএনপির নেতা বা পদ-পদবি থাকলে জেলা পরিষদে থাকা যাবে—এটাই যেন এখন এখানকার কোটা।

পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ গঠনে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের দলীয়করণের ফলে পার্বত্য এলাকার মানুষের অধিকার, উন্নয়ন ও প্রত্যাশা থেকে তারা বঞ্চিত হবে।

সারজিস বলেন, ‘আমরা বিএনপির এই সিদ্ধান্তের প্রতি তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। প্রত্যেকটি জায়গায় এ ধরনের দলীয়করণ বিএনপির জন্য কিংবা দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না।’

সভায় খাগড়াছড়ি জেলা এনসিপির আহ্বায়ক নূর আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, আলী আহসান জুনায়েদসহ স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। এতে এনসিপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।