খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও ডিস-লিপিডেমিয়ার (রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রা) প্রকোপ ক্রমশ বাড়ছে। এসবের প্রভাবের ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ এখন লিভারের রোগ ও লিভার অকার্যকর হওয়া বা লিভার ফেইলিওরের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি ছিল লিভার রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বজুড়ে, এমনকি বাংলাদেশেও লিভার সিরোসিস ও লিভার প্রতিস্থাপনের পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, যা প্রতিনিয়ত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও বিশ্বব্যাপি নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এর আনুমানিক প্রকোপ ৩২%। বিশ্বব্যাপি এই হার প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায় ৪০% এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৬%। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই প্রবণতা আরও বাড়ছে।
ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কারণে বৃহত্তর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে লিভার ফেইলিওরের প্রাদুর্ভাব প্রায় ৩০% পর্যন্ত পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমীক্ষা অনুযায়ী এই হার ১৪% থেকে ৩৪.৩% এর মধ্যে ওঠানামা করে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ অঞ্চলে স্থূলতাহীন বা স্বাভাবিক ওজনের ব্যক্তিদের মধ্যেও নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এর হার তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশে জনসংখ্যা-ভিত্তিক ক্রস-সেকশনাল সমীক্ষায় দেখা গেছে, এর সামগ্রিক প্রাদুর্ভাব প্রায় ৩৩.৮৬% এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে প্রায় ৫০% পর্যন্ত পৌঁছায়।
বাংলাদেশে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্য জটিলতার ক্ষেত্রে সঠিক পরামর্শ ও চিকিৎসা গ্রহণ। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে সাদা ভাতের পরিমাণ কমিয়ে তাজা সবজি ও লাল/গোটা শস্য খাওয়া উচিৎ। তেলে ভাজা খাবারের পরিবর্তে স্ন্যাকস হিসেবে ফলমূল, চিড়া, ওটস ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে, কারণ ভাঁজাপোড়া খাবারে ক্ষতিকর ট্রান্স-ফ্যাট থাকে। সফট ড্রিংকস, প্যাকেটজাত জুস, চিনিযুক্ত চা বা লাচ্ছি’র মতো পানীয় এড়িয়ে চলা উচিৎ, কারণ এগুলো লিভারের ওপর অতিরিক্ত চিনির চাপ সৃষ্টি করে। এর পরিবর্তে ডাবের পানি, ফ্রেশ জুস ইত্যাদি পান করা যেতে পারে।
শারীরিক সক্রিয়তা ও ওজন নিয়ন্ত্রণে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট দ্রুতগতিতে হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার ইত্যাদি কার্যক্রম করা উচিৎ। শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৫% থেকে ৭% কমালেই লিভারের চর্বি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বাড়ি বা কর্মস্থলে দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে শারীরিক চলাফেলা বজায় রাখা উচিৎ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডায়াবেটিস পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ। কারণ এটি ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের লিপিড ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বিশেষত, মধ্যবয়সী বা অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিৎ।
লিভারের যেকোন ধরনের জটিলতা সময়মতো শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ চিকিৎসক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামবাসীদের জন্য এসব পরীক্ষা ও পরামর্শ নেওয়ার সেরা গন্তব্যস্থল এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম। এখানে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও হেপাটোলজি বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ফ্যাটি লিভারসহ লিভারের যাবতীয় রোগের আধুনিক ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসা করা হয়।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত সার্বিক সেবা এখানে নিশ্চিত করা হয়। তাই সবাই স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হোন, সুস্থ থাকতে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনুন এবং জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
লেখক
সিনিয়র কনসালটেন্ট, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজি
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম


